ভাই বোনেদের পবিত্র উৎসব রাখী বন্ধন ও রাখী পূর্ণিমার ইতিহাস (Rakhi Bandhaner Itihas Bangla)

ভারতীয় সংস্কৃতিতে ভাইবোনের পবিত্র উৎসব হল রাখী বন্ধন (Rakhi Bandhan),উৎসব। আমরা আজকে ভাইবোনের পবিত্র সম্পর্কের বন্ধনের উৎসব রাখী বন্ধনের ইতিহাস,রাখি বন্ধন নিয়ে কবিতা

এবং রাখী পূর্ণিমার তাৎপর্য নিয়ে দু-চারটি কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরব। রাখী বন্ধন (Rakhi Bandhan) উৎসবের মধ্যে দিয়েই ভাই ও বোনের সম্পর্কের মধ্যে এক প্রীতিবন্ধন গড়ে ওঠে।

ভারতীয় সংস্কৃতিতে রাখী বন্ধন উৎসবের প্রচলিত ইতিহাস বহু পুরোনো। আগেকার দিনে রাজারা যুদ্ধে যাওয়ার আগে রানীরা রাজার ডান হাতে সুতো বেঁধে দিয়ে রাজার বিনষ্ট না হওয়ার আশায় মঙ্গল কামনা করতো।

Table of Contents

রাখী বন্ধন কী (Rakhi Bandhan ki Bangla)


রাখী বন্ধন উৎসব হল ভাই ও বোনের সম্পর্কের প্রীতিবন্ধনের উৎসব। প্রতি বছর শ্রাবন মাসে রাখী পূর্ণিমার দিন রাখী বন্ধন উৎসব সমগ্র ভারতবর্ষ তথা বিশ্ববাসী

দিদি ও বোনেরা,ভাই ও বোনের এই সম্প্রীতির রাখী বন্ধন উৎসব মহাআনন্দে উৎযাপন করে থাকেন। রাখী পূর্ণিমার দিন হিন্দু পঞ্জিকার শুভ লক্ষণ ও সময় অনুযায়ী

দিদি ও বোনেরা তাদের দাদা ও ভাইদের ডান হাতের কবজিতে ঈশ্বরকে উৎসর্গ করে একটি সুতো দাদা ও ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় বেঁধে দেয়।

হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস মতে দিদি ও বোনেরা ভাই ও দাদাদের হাতে রাখীর সুতো বেঁধে দেয়  যাতে দাদা ও ভাইদের সমস্ত রকম অশুভ শক্তি থেকে রাখীর সুতো রক্ষা কবচের ন্যায় রক্ষা করবে।

বিনিময়ে দাদা ও ভাইয়েরা তাদের দিদি ও বোনদের আমরণ রক্ষা করার শপথ নেয়। এরপর চলে একে অপরকে মিষ্টি মুখ করানো এবং দাদা ও বোনেদের উপহার বিনিময়ের পালা।

রাখী বন্ধনের ইতিহাস
রাখী বন্ধনের ইতিহাস

তবে ভাই ও বোনের সম্পর্ক মানে শুধু যে রক্তের সম্পর্ক থাকলেই বোনেরা ভাইদের রাখী পড়াবে এমন কোনো বাধ্য বাধকতা নেই। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও

কাকার মেয়ে,মামার মেয়ে কিংবা আত্মীয় সম্পর্কে ভাই বোনের সম্পর্ক থাকলেও দাদা ও ভাইয়েরা বোনেদের কাছ থেকে রাখী পড়তে পারেন।

রাখী বন্ধন উৎসব ও রাখী বাঁধার নিয়ম


রাখী বন্ধন উৎসবে রাখী বাঁধার জন্য কিছু নির্দিষ্ট বাঁধা ধরা নিয়ম আছে। প্রতি বছর শ্রাবন মাসে রাখী পূর্ণিমার দিন পঞ্জিকা মতে শুভক্ষণ অনুযায়ী বোনেরা তাদের ভাইদের হাতে রাখী পড়িয়ে দেয়।

রাখী পড়ানোর জন্য ভাই বোন দুজনেই ঐ দিন উপোষ করে থাকে তারপর পঞ্জিকার শুভক্ষণ অনুযায়ী বোন ভাইকে একত্রিত হয়ে আসন পেতে বসতে দেয়।

তারপর বোনেরা ভাইদের কপালে অক্ষত চাল সহ রক্ত চন্দনের তিলকের ফোঁটা পড়িয়ে দেয়। এরপর ভাইরা তাদের মাথা কোনো পরিষ্কার কাপড় কিংবা রুমাল দিয়ে ঢেকে নেয়।

তারপর থালা সহযোগে বোনেরা খোসা ছাড়ানো গোটা নারিকেল ভাইদের উপহার স্বরূপ হাতে তুলে দেয়। এরপর বোনেরা ভাইদের ডান হাতের কবজিতে রাখী বেঁধে দেয়।

তারপর বোনেরা ভাইদের মুখে মিষ্টি দিয়ে মিষ্টি মুখ করিয়ে,হাতে বরন ডালা নিয়ে ভাইদের সব বিপদ আপদ থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে আরতির থালা নিয়ে আরতি করতে হয়। এবারে বোন যদি ছোট হয়

তাহলে বোন দাদার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে দাদার কাছ থেকে আশীর্বাদ নেবে,আর যদি ভাই ছোট হয় তাহলে একইভাবে ভাই দিদির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে দিদির কাছ থেকে আশীর্বাদ নেবে।

আরো পড়ুন : অকাল বোধন কি ? বাংলার প্রথম দুর্গাপূজার ইতিহাস। 

রাখী বন্ধনের ইতিহাস ও রাখী বন্ধন উৎসবের পৌরাণিক তাৎপর্য 


রাখি পূর্ণিমার ইতিহাস ও রাখি বন্ধন নিয়ে অনেক পৌরাণিক আখ্যা পাওয়া যায়। আসুন রাখি পূর্ণিমার তাৎপর্য নিয়ে পৌরাণিক আখ্যা গুলোর দিকে একটু চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

মহাভারতে দ্রৌপদী ও কৃষ্ণের রাখী বন্ধন উৎসব (Rakhi Bandhan Utsav Bangla)

মহাভারতের কাহিনী অনুযায়ী শ্রী কৃষ্ণ তার বোন সুভদ্রা অপেক্ষা তার পাতানো বোন পঞ্চ পাণ্ডবদের স্ত্রী দ্রৌপদীকে অধিক স্নেহ করতেন।

নিজ বোন সুভদ্রা অপেক্ষা পাতানো বোন দ্রৌপদীর প্রতি কৃষ্ণের অত্যাধিক স্নেহ বোন সুভদ্রার দৃষ্টিগোচর হয়না। তখন সুভদ্রা একদিন তার দাদা শ্রী কৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করেই ফেললেন,

দাদা আমি তো তোমার নিজের বোন তবু আমার অপেক্ষা তুমি কেন দ্রৌপদীকে আমরা অপেক্ষা বেশি স্নেহ কর ? ভগবান শ্রী কৃষ্ণ তখন সুভদ্রাকে বুঝিয়ে বললেন

সময় হলে আমার দ্রৌপদীকে স্নেহ করার কারণ তুমি নিজেই বুঝতে পারবে,সুতরাং আমাকে আর এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিওনা।

এরপর একদিন সত্যি সত্যি শ্রী কৃষ্ণের সুভদ্রাকে জবাব দেওয়ার সময় এল। রাজসূয় যজ্ঞের পশ্চাতে শিশুপালকে বধ করার পরে ভগবান শ্রী কৃষ্ণের হাতের তর্জনী আঙুলটি সুদর্শন চক্রে কেটে গেছিল,

তখন সুভদ্রা ভগবান শ্রী কৃষ্ণের আঙুল থেকে রক্ত ক্ষরণ থামানোর জন্য ক্ষত স্থানে পট্টি বাঁধতে একটি ভালো কাপড়ের সন্ধ্যান করতে অন্দর মহলে চলে গেলেন ।

অপরদিকে শ্রী কৃষ্ণের হাতে ক্ষত হওয়ার খবর পেয়ে দ্রৌপদী সেখানে দৌড়ে আসে এবং তৎক্ষণাৎ নিজের শাড়ীর আঁচল ছিড়ে শ্রী কৃষ্ণের আঙুলের ক্ষতের জায়গায় পট্টি বেঁধে দেয়।

সুভদ্রা পরে হাতে পট্টি বাঁধতে এসে দেখে দ্রৌপদী তার আগেই নিজের আঁচল ছিড়ে শ্রী কৃষ্ণের হাতে পট্টি বেঁধে দিয়েছে,তখন সুভদ্রা তার নিজের ভুল এবং শ্রী কৃষ্ণের পূর্বের দেওয়া ইঙ্গিতে

দ্রৌপদী স্নেহের কারণ বুঝতে পেরে লজ্জা পায়। আসলে সকল দাদা ও বোনের সম্পর্কের মধ্যে নির্ভেজাল প্রেমের সম্পর্কের কাছে পৃথিবীর সকল দামী বস্তুই যে তুচ্ছ

সেটা শ্রী কৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর ভাইবোনের সম্পর্ক সেটা প্রমান করে দিয়েছে। তখন ভগবান শ্রী কৃষ্ণ দ্রৌপদীর এই ঋণ সময় হলে শোধ করার অভয় দেয়।

এরপর যখন পান্ডব ও কৌরবদের পাশা খেলায় দ্রৌপদীকে বাজি রাখলে পাণ্ডবরা পরাজিত হয়। তখন কৌরব পুত্র দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্র হরণ করতে উদ্যত হলে

শ্রী কৃষ্ণ তখন কাপড় দিয়ে পাতানো বোন দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করে। এরপর থেকে দ্রৌপদী নিয়ম করে প্রতি বছর ঐ দিনটাকে স্মরণ করে

রাখী পূর্ণিমার দিন প্রতি বছর শ্রী কৃষ্ণ এবং দ্রৌপদীর ভাইবোনের প্রেমের সম্পর্কের নিরিখে,ভগবান শ্রী কৃষ্ণের ডান হাতের কবজিতে রাখী পড়াত।

আর এই ভাবে ভাইবোনের অটুটু ভালোবাসা ও প্রেমের বন্ধনের উৎসব পবিত্র রাখী বন্ধন উৎসবের সূচনা হয় এবং পড়ে তা জনমানবের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বলে মনে করা হয়।

আরো পড়ুন : ইন্ডিয়া গেট নির্মাণের ইতিহাস। 

পুরাণে মা লক্ষী ও বলিরাজার রাখী বন্ধন উৎসব 

মহারাজা বলি ছিলেন মা লক্ষীর বর নারায়ণের উপাসক ও এক নিষ্ঠ ভক্ত। তাই ভগবান নারায়ণ বলিরাজের ভক্তিতে এতটাই সন্তস্ট ছিলেন যে,

স্বয়ং নারায়ণ বৈকুন্ঠ ধামে মা লক্ষীকে রেখে এসে রাজা বলির রাজ্যে এসে বলি রাজার রাজ্য রক্ষা করার দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নেয়।

তখন বৈকুন্ঠ ধামে মা লক্ষী স্বামী নারায়ণকে ছেড়ে একা থাকতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তিনিও এক সাধারণ মহিলার ছদ্মবেশে রাজা বলির রাজ্যে এসে বলিরাজের ঘরে আশ্রয় প্রার্থনা করে বলেন,

হে বলিরাজা আমার স্বামী দীর্ঘদিন যাবৎ নিখোঁজ তার কোনো পাত্তা খবর পাওয়া যাচ্ছেনা,তাই আমি আমার স্বামীকে খুঁজতে তোমার রাজ্যে এসেছি।

বলিরাজা তখন মা লক্ষীর দুঃখের কথা শুনে যতদিন পর্যন্ত তিনি তার স্বামীকে খুঁজে না পায় ততদিন পর্যন্ত তার প্রসাদে আশ্রয় গ্রহণ করার কথা বলেন।

এরপর বলিরাজার ঘরে থাকতে থাকতে শ্রাবন মাস এলে,শ্রাবন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে বলিরাজার ডান হাতের কবজিতে মা লক্ষী একটা সুতো বেঁধে দেয়।

বলিরাজ তখন হঠাৎ করে মা লক্ষীর কাছে হাতের কবজিতে সুতো বাঁধার কারণ জিজ্ঞাসা করে ? তখন মা লক্ষী তার আসল পরিচয় দিয়ে বলিরাজাকে সমস্ত কথা খুলে বলে।

রাখী বন্ধনের ইতিহাস
রাখী বন্ধনের ইতিহাস

বলিরাজাকে ভাই হিসাবে গ্রহণ করে মা লক্ষী নিজে থেকেই বলিরাজার হাতে সমস্ত বিপদ আপদ থেকে রক্ষার জন্য সুতো বেঁধে দিয়েছিলেন।

তখন বলিরাজ সমস্ত কিছু জেনে ভাইবোনের ভালোবাসার প্রতিদান স্বরূপ নারায়ণকে মা লক্ষীর সঙ্গে বৈকুন্ঠ ধামে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানায়।

সেই থেকে সমস্ত ভাই ও বোনেরা শ্রাবন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ভাইবোনের ভালোবাসায় একে অপরের মঙ্গল কামনায় রাখী বন্ধন উৎসব পালন করে।

সন্তোষী মা,শুভ ও লাভ এর রাখী বন্ধন উৎসব (Rakhi Bandhan utsav) 

রাখী বন্ধন উৎসবের আর একটি পৌরাণিক কাহিনী আছে। একবার গণেশের বোন লক্ষী ও স্বরসতী গণেশের হাতে একটি লাল সুতো বেঁধে দেয়।

তখন গণেশের দুই পুত্র শুভ ও লাভ বাবার হাতে তার পিসিদের দ্বারা সুতো বাঁধতে দেখে তারাও গণেশের কাছে একটি বোন চেয়ে বসেন।

কিন্তু তখন গণেশের কোনো মেয়ে ছিলনা তাই শুভ ও লাভ এর কোনো বোনও ছিলনা। তখন শুভ ও লাভ কে সন্তস্ট করার জন্য গণেশ অগ্নিকুন্ড নির্মাণ করে সেখান থেকে একটি কন্যার জন্ম দেয়।

যেহেতু শুভ ও লাভ এর সন্তুষ্টির জন্য অগ্নিকুন্ড থেকে গণেশ কন্যার জন্ম দিয়েছিলেন তাই তার নাম দেওয়া হয় সন্তোষী মা। এরপরে সন্তোষী মা তাদের ভাই শুভ ও লাভ এর হাতে সুতো দিয়ে রাখী বেঁধে দেয়।

আরো পড়ুন : বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল রহস্য। 

রাখী বন্ধন উৎসবের ঐতিহাসিক তাৎপর্য


আসুন এবারে রাখী বন্ধন উৎসবের কিছু ঐতিহাসিক তাৎপর্য সমন্ধে অবগত হওয়া যাক। রাখী বন্ধন উৎসবের বেশ কিছু ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে।

গ্রীকবীর আলেকজান্ডারের স্ত্রী রোজানা ও ভারতের পুরু রাজার রাখী বন্ধন উৎসব 

৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিকবীর আলেকজান্ডার ভাতবর্ষ আক্রমণের জন্য রওনা হলে,আলেকজান্ডারের স্ত্রী রোজানা মহারাজা পুরুকে একটি রাখি স্বরূপ একটি সুতো পাঠিয়ে,

পুরু রাজার কাছে আলেকজান্ডারের যাতে কোনো ক্ষতি না করে সেই অঙ্গীকার প্রাথনা করেন। মহারাজা পুরু ছিলেন একজন কটোচ হিন্দু রাজা।

তাই তিনি রাখী কে সম্মান করতেন তাই রাজা পুরু আলেকজান্ডাররের স্ত্রী রোজানার পাঠানো রাখীর সম্মানে যুদ্ধক্ষেত্রে আলেকজান্ডারকে নিজে অস্ত্রাঘাত করেননি।

রানী কর্ণবতী ও সম্রাট হুমায়ূনের রাখী বন্ধন 

১৫৩৫ সালে গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ রাজস্থানের চিতোর আক্রমণ করলে,চিতোরের বিধবা রানী কর্ণবতী নিরুপায় হয়ে দিল্লীর সম্রাট হুমায়ুন কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে হুমায়ূনকে একটি রাখী পাঠায়।

রানী কর্ণবতীর রাখী পেয়ে সম্রাট হুমায়ুন অবিভূত হয়ে রানী কর্ণবতী ও চিতোর রক্ষা করার জন্য সৈন্য পাঠিয়ে দেন। কিন্তু দুঃভাগ্য বশত হুমায়ূনের সৈন্য পৌঁছোবার আগেই বাহাদুর শাহ চিতোর আক্রমণ করে বসেন।

১৫৩৫ সালের ০৮ ই মার্চ নিরুপায় চিতোর রানী কর্ণবতী তখন জহর ব্রত পালনকরে ১৩,০০০ পুর স্ত্রী সহ নিজেকে অগ্নি আহুতি দেয়।

পরে হুমায়ুনের সেনা চিতোর গড়ে পৌঁছে বাহাদুর শাহকে উৎখাত করে রানী কর্ণবতীর পুত্র বিক্রমজিৎ কে চিতোরের সিংহাসনে আসীন করেন।

রাখী বন্ধনের ভিডিও গান


রাখী বন্ধন উৎসব কে প্রতিষ্ঠা করেন (Rakhi Bandhan ke protistha koren)


১৯০৫ সালের ১৬ ই অক্টবর লর্ড কার্জনের নের্তৃত্বে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সূচনা হয়। ১৭৬৫ সালের পর থেকে অবিভক্ত বাংলা ওড়িশা এবং বিহার বাংলার অভিন্ন অঙ্গ ছিল।

কিন্তু ভারতে ব্রিটিশ রাজ শুরু হলে ইংরেজদের পক্ষে এত বড় রাজ্যের শাসনভার সামলানো দায় হয়ে ওঠে তাছাড়া সেই সময় বাংলা থেকেই ভারতের অন্যত্র ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চরম আকার ধারণ করলে,

ব্রিটিশরা তখন বাংলা ভেঙে পৃথক পৃথক রাজ্য তৈরী করবে বলে ঠিক করে। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ সহ ভারতের আরো অন্যান্য মনীষীরা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের তীব্র প্রতিবাদ জানায়।

১৯০৫ সালের জুন মাসে ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ (বাংলা ভাগ) করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টবর বঙ্গভঙ্গ আইন পাস হয়ে যায়।

প্রতিবছর শ্রাবন মাসের পূর্ণিমার দিন হিন্দু ধর্মালম্বী মানুষরা রাখী বন্ধন উৎসব পালন করে থাকেন। তখন ১৯০৫ সালে পূর্ব বাংলার ভাঙন রোধ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ

ঢাকা,সিলেট,সহ আরো অন্যান্য হিন্দু ও মুসলিম ভাইবোনদের ঐক্যবদ্ধ করে একত্রিত করার লক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে রাখী বন্ধনের সূচনা করেন।

রবীন্দ্রনাথের রাখি বন্ধন উৎসব


ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গ কিভাবে আঁটকানো যায় সেই বিষয় নিয়ে সবাই যখন চিন্তিত। তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এগিয়ে এসে বললেন রাখি বন্ধন উৎসব করতে হবে।

বাঙালির মনে প্রাণে ঐক্যের সুর বাঁধতে হবে। কিন্তু হঠাৎ করে কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন করাতো আর ছেলেখেলা নয় তার জন্য পরিকল্পনা চায়,পুরো দমে আয়োজন চায়।

যাইহোক ঠিক হল অতসব নারি নক্ষত্র বিচার না করে যেদিন ইংরেজ সরকার বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব পারিত করবে সেই দিনই রবীন্দ্রনাথ রাখি বন্ধন উৎসব উদযাপন করা হবে।

হিন্দু পঞ্জিকাতে যদিও প্রতিবছর শ্রাবন মাসের পূর্ণিমার দিন মানে রাখি পূর্ণিমায় ভাই বোনের রাখি বন্ধন উৎসব পালন করা হয়। কিন্তু সেবছর পঞ্জিকায় উল্লেখিত তারিখ ছাড়াও

আরো একদিন রাখি বন্ধন উৎসব পালন করা হল। অথাৎ একই বছরে দুই বার রাখি বন্ধন উৎসব পালন। একবার পঞ্জিকা মতে সকল দিদি ও বোনেরা তাদের দাদা ও ভাইদের হাতে রাখি পড়িয়েছিল।

আর একবার ১৯০৫ সালের ১৬ ই অক্টবর বঙ্গভঙ্গের দিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে হিন্দু ও মুসলমান সৌভ্রাত্ব বোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাখি বন্ধন উৎসব উদযাপিত হল।

যদিও সেই বছর ক্ষেত্রমোহন গোস্বামীর চেষ্টায় দিনটি পঞ্জিকাতে স্থান পেয়েছিল কিন্তু দিন যাওয়ার সাথে সাথে এখনকার পঞ্জিকাতে,১৬ ই অক্টবর রবীন্দ্রনাথের রাখি বন্ধন উৎসব পালনের

দিনটির উল্লেখের কথা তলিয়ে গেছে। এখন আর কোনো পঞ্জিকাতে রবীন্দ্রনাথের রাখি বন্ধন উৎসবের দিনের আলাদা করে কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়না।

রবীন্দ্রনাথের রাখি বন্ধন তখনকার দিনে বড়সড় রাজনৈতিক কার্যক্রমের মধ্যে একটি ছিল। তখনকার দিনে ঠাকুর বাড়ির ছেলেরা রাজ আদব কায়দায় গাড়ী চড়তো।

ঠাকুর বাড়ির ছেলেদের মাটিতে পা ফেলা ছিল ভার। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু সেই চিরাচরিত ঠাকুর বাড়ির আদব কায়দা ভেঙে কলকাতার জগন্নাথ ঘাটেগঙ্গা স্নান সেরে রাখি পড়ালেন।

রবীন্দ্রনাথের সাথে সাথে পায়ে পায়ে পা মিলিয়ে যোগ দিলেন ঠাকুর বাড়ির আরো অন্যান্য তরুণেরা। বাদ পড়লনা ঠাকুর বাড়ির ঝি চাকরেরাও,তারাও রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গ দিলেন।

তখন কার দিনে ছুঁই-ছুত,জাত-পাত,উঁচু-নিচু ভেদাভেদ ছিল চরম পর্যায়ে,কিন্ত রবীন্দ্রনাথ সেই ভেদাভেদ মিটিয়ে সেদিন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রতিবাদে

হিন্দু মুসলমান সৌভ্রাত্ববোধ গড়ে তোলার লক্ষে উঁচু-নিচু,জাত-পাত ও ভেদাভেদ ভুলে একসাথে পায়ে পা মিলিয়ে হিন্দু ও মুসলমানে একে অপরকে রাখি পড়িয়ে ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গের মূলে আঘাত হানলেন।

গঙ্গাঘাটে গঙ্গা স্নানের পর বঙ্গচ্ছেদে রাখি বন্ধনের ইশতেহার ছাপানো হল। সেই ইশতেহারে স্বাক্ষর করে ইতিহাসের স্বাক্ষী থাকলেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়,বিপিন চন্দ্র পাল,রাম সুন্দর ত্রিবেদীর মত ব্যক্তিত্বরা।

ঠিক করা হল দুই বাংলার বাঙালিদের ঐকতানের কথা খেয়াল রেখে বাঙালিরা প্রতিবছর ১৬ ই অক্টবর দিনটিকে রাখি বন্ধন উৎসব হিসাবে পালন করবে।

এরপর ব্যস্ত পায়ে শুরু হল রাখি বন্ধনের শোভাযাত্রা। রবীন্দ্রনাথের লেখা বাংলার মাটি,বাংলার জল,বাংলার বায়ু বাংলার ফল গানের সুর যেন প্রাণ পেয়ে জীবিত হয়ে উঠল দিনেদ্রনাথের গলায়।

শোভাযাত্রায় যেতে যেতে রাস্তায় যার দেখা পাওয়া যায় তাকে ধরেই  হাতে রাখি পড়ানো হয়। বাদ পড়লনা রাস্তার ধরে ঘোড়ার পিঠ মালিশ করা মুসলিম জাতের ঘোড়া সহিসেরা।

হিন্দুদের রাখি মুসলমান ঘোড়া সহিসদের হাতে বাঁধতে দেখে প্রথমে সবার মধ্যে কিঞ্চিত ধোঁয়াশা সৃষ্টি করলেও ধোঁয়াশা কাটতে না কাটতে তাদের কোলে তুলে নিয়ে আনন্দ নৃত্য শুরু হল।

রাখি বন্ধনের আনন্দে জাত পাত ও ভেদাভেদ ভুলে,রাখি উৎসবের আনন্দে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল সবাই। এবারে যেন রবীন্দ্রনাথের রাখি বন্ধনের শোভাযাত্রা পূর্ণতা লাভ করল।

শোভাযাত্রার মাঝে রবীন্দ্রনাথ ঠিক করলেন চিৎপুরে মসজিদে গিয়ে মুসলিম মৌলভী ও মাওলানাদের হাতে রাখি বাঁধবেন। কিন্তু মুসলিম মাওলানাদের হাতে রাখি বাঁধা মানে জাত পাত নিয়ে ধর্মের লড়াই।

সবাই ভাবল এই নিয়ে তুমুল রক্তারক্তি একটা সরগরম কান্ড ঘটবে। কিন্তু সেই দিন তেমন কোনো অপ্রীতিকর কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেনি। রবীন্দ্ৰনাথ চিৎপুরে মসজিদে,

মসজিদের ভিতরে গিয়ে মৌলভী ও মাওলানাদের হাতে রাখি বেঁধে দিলেন। কিন্তু সেদিন কোনোরকম রক্তারক্তি কান্ড ঘটলনা না হিন্দু ও মুসলমান সকলেই রাখি বন্ধনের সৌভ্রাত্বের আনন্দে মেতে উঠলেন।

রাখি বন্ধনের কবিতা 


ব্রিটিশ আইন সভায় বঙ্গভঙ্গ আইন পাস হয়ে গেলে বাংলা ভেঙে ভাগ হয়ে যায়। পূর্ব বাংলার মুসলমানরা  বিভক্ত পূর্ব বঙ্গে কর্মসংস্থান ও শিক্ষার অগ্রগতী হবে

এই মর্মে সন্তুষ্টি পেলেও,পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ বাংলার এই বিভক্তি মন থেকে মেনে নিতে পারল না। তারা সেই সময় প্রচুর পরিমানে জাতীয়তাবাদী গান লিখে প্রকাশ করতে থাকে।

স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর  বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে মর্মস্পর্শী গান আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি রচনা করেন যা পরে গিয়ে ১৯৭২ সালে বাংলা দেশের জাতীয় সংগীত হিসাবে জায়গা পায়।

রবীন্দ্রনাথ রাখী বন্ধনের মধ্যে দিয়ে দুই বাংলার মানুষকে একত্রিত করে একই সুতোয় বাঁধার উদ্দেশ্যে রাখী বন্ধনকে উৎসর্গ করে দুই বাংলার মানুষের সম্প্রীতি রক্ষার উদ্দেশ্যে রাখি বন্ধনের কবিতা রচনা করলেন-

বাংলার মাটি বাংলার জল,বাংলার বায়ু বাংলার ফল 

পুণ্য হউক,পুণ্য হউক,পুণ্য হউক হে ভগবান।

বাংলার ঘর,বাংলার হাট,বাংলার বন,বাংলার মাঠ,

পুণ্য হউক,পুণ্য হউক,পুণ্য হউক হে ভগবান।

বাঙালির পণ,বাঙালির আশা,বাঙালির কাজ,বাঙালির ভাষা 

পুণ্য হউক,পুণ্য হউক,পুণ্য হউক হে ভগবান।

বাঙালির প্রাণ,বাঙালির মন,বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন

এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান।

 

রাখি বন্ধন কবিতা নজরুল ইসলাম


ভাই বোনের রাখি বন্ধন উপলক্ষে রাখি বন্ধন নিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা খুব সুন্দর একটা কবিতা আছে রাখি বন্ধন আপনারা চাইলে একবার রাখি বন্ধন কবিতা টি পাঠ করে দেখতে পারেন।

রাখি বন্ধন 

…………….. কাজী নজরুল ইসলাম

 

সই পাতালো কি শরতে আজিকে স্নিগ্ধ আকাশ ধরণী?
নীলিমা বাহিয়া সওগাত নিয়া নামিছে মেঘের তরণী!
অল্কার পানে বলাকা ছুটিছে মেঘ দূত মন মোহিয়া
চঞ্চুতে রাঙ্গা কলমীর কুঁড়ি- মরতের ভেট বহিয়া।
সখীর গাঁইয়ের সেঁউতি- বোঁটার ফিরোজায় রেঙ্গে পেশোয়াজ
আসমানী আর মৃন্ময়ী সখী মিশিয়াছে মেঠো পথ মাঝ।
আকাশ এনেছে কুয়াশা উড়ুনী, আসমানী নীল সাঁচুলী,
তারকার টিপ, বিজলীর হার, দ্বিতীয় চাঁদের হাঁসুলী।
ঝরা বৃষ্টির ঝরঝর আর পাপিয়া শ্যামার কূজনে
বাজে নহবত আকাশ ভূবনে সই পাতিয়েছে দু-জনে!
আকাশের দাসী সমীরণ আনে শ্বেত পেঁজা- মেঘ ফেনা ফুল,
হেথা জলে থলে কুমুদে আলুথালু ধরা বেয়াকুল।
আকাশ গাঙ্গে কি বান ডেকেছে গো, গান গেয়ে চলে বরষা
বিজুরীর গুণ টেনে টেনে চলে মেঘ- কুমারীরা হরষা।
হেথা মেঘ পানে কালো চোখ হানে মাটির কুমার মাঝিরা
জল ছুড়ে মারে মেঘ-বালা দল, বলে- ‘চাহে দেখ পাজীরা!’
কহিছে আকাশ,ওলো সই, তোর চকোরে পাঠাস নিশিথে
চাঁদ ছেনে দেবো জোছনা- অমৃত তোর ছেলে যত তৃষিতে।
আমারে পাঠাস সোঁদা সোঁদা বাস তোর ও-মাটির সুরভি,
প্রভাত ফুলের পরিমল মধু,সন্ধ্যাবেলার পুরবী!
হাসিয়া উঠিল আলোকে আকাশ,নত হ’ইয়ে এল পুলকে,
লতা-পাতা-ফুলে বাঁধিয়া আকাশে ধরা কয়,সই, ভূলোকে
বাঁধা প’লে আজ’, চেপে ধরে বুকে লজ্জায় ওঠে কাঁপিয়া,
চুমিল আকাশ নত হ’ইয়ে মুখে ধরণীরে বুকে ঝাঁপিয়া।

FAQ


প্রশ্ন- রাখী পড়ানোর সময় ভাইদের কোনদিকে বসতে হয় ?

উঃ- রাখী পড়ানোর সময় ভাইদের পূর্বদিকে মুখ করে বসতে হয়।

প্রশ্ন- ভাইদের কোন হাতে রাখী পড়াতে হয় ?

উঃ- ভাইদের ডান হাতের কবজিতে রাখী পড়াতে হয়।

প্রশ্ন- রাখী বন্ধন উৎসব হয় কোন পূর্ণিমায় ?

উঃ- শ্রাবন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে রাখী বন্ধন উৎসব হয়।

প্রশ্ন- রাখি বন্ধন উৎসব কে প্রতিষ্ঠা করেন ?

উঃ- রাখি বন্ধন উৎসব ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় হিন্দু মুসলমান ঐক্যতান গড়ার লক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখি বন্ধন উৎসব প্রতিষ্ঠা করেন।

প্রশ্ন- রাখি বন্ধন কখন অনুষ্ঠিত হয় ?

উঃ- ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে রাখি বন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

পরিশিষ্ট


ভাইবোনের ভালোবাসার সম্প্রীতির উৎসব হল রাখী বন্ধন (Rakhi Bandhan) উৎসব। রাখী বন্ধনের ইতিহাস এবং পৌরাণিক আখ্যা সহ রাখী বন্ধনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য সংক্ষেপে আপনাদের সামনে তুলে ধরা হল।

আশা করি রাখী বন্ধনের ইতিহাস নিয়ে তুলে ধরা আমাদের কিঞ্চিৎ প্রয়াস কিছুটা হলেও আপনাদের উপকারে লাগবে। আমাদের লেখা আপনাদের ভালো লাগলে আমার কর্ম স্বার্থক হবে বলে মনে করব।

আপনাদের মনে রাখী বন্ধন বা রাখী পূর্ণিমার তাৎপর্য নিয়ে কোনো জিজ্ঞাসা থাকলে আমাদের কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন।

আর যদি আমাদের আর্টিকেলটি আপনার মনঃপুত বলে মনে হয় তাহলে অনুগ্রহ করে আপনার প্রিয়জনদের মধ্যে শেয়ার করে দেবেন। ধন্যবাদ।

এই আর্টিকেল গুলোও পড়ে দেখুন-