জমির রেকর্ড কি ? কেন করবেন জমির রেকর্ড ?

আজকাল আমরা সবাই জমি জমা বিক্রয় সংক্রান্ত ব্যাপারে কম বেশি পরিচিত সুতরাং এটা আশা করা যেতেই পারে আপনারা জমির রেকর্ড কি ? নামজারী ব্যাপারটাও কম বেশি জানেন।

জমির রেকর্ডঅথাৎ নামজারী ব্যাপারটা শহরাঞ্চলে ততটা প্রয়োজনীয় না হলেও গ্রামাঞ্চলে জমি জমা কেনা বেচার ক্ষেত্রে নামজারী একটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কৃষিজমি অথাৎ চাষযোগ্য জমির ক্ষেত্রে শুধু জমির সেল ডিড হয়ে যাওয়ার জমির রেজিষ্টি প্রসেসেই শেষ কথা নয়। গ্রামাঞ্চলে ভূমি অধিনিয়ম অনুযায়ী যতক্ষণ পর্যন্ত জমির রেকর্ড (নামজারী) করার নিয়ম

(Plot mutation Process) পুরো না হচ্ছে,ততক্ষন পর্যন্ত জমির দলিলকে জমির ফাইনাল ডকুমেন্ট হিসাবে গণ্য করা হবে না।

তাই আপনারা যারা হয়ত জমির রেকর্ড কি ? জমির রেকর্ড সংশোধন করা কেন জরুরী ব্যাপারটা নিয়ে ভালোভাবে জানতে চান তাদের জন্য

এখানে জমি নামজারী বা জমির রেকর্ড কাকে বলে,জমির রেকর্ড করার নিয়ম,জমির রেকর্ড করতে কি কি লাগে পুরো ব্যাপারটা সংক্ষেপে তুলে ধরা হল আশা করি আপনাদের উপকারে লাগবে।

আরো পড়ুন : জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২০

জমির রেকর্ড কাকে বলে ? জমি রেকর্ড করার নিয়ম


জমি (Plot) সাধারণত দুই ধরণের হয়ে থাকে। যেমন- ০১. কৃষিজমি (Agriculture Property),০২.নির্মিত মান বাড়ি/বাসভূমি/ব্যবসায়িক দোকান (Build property)

যখন কোন জমি অথবা জায়গার মালিকানা হক একজনের নাম থেকে অন্য জনের নামে স্থানান্তর করা দরকার হয়  তখন তার সাথে সাথে জমির রেকর্ড (নামজারী) করার প্রয়োজন হয়।

সাধারণ ভাবে জমি জমা ক্রয় করার পর Sub Register Office এ গিয়ে Stamp Duty দেওয়ার পর (Paid) করার পর জমির Sale Deed রেজিস্টার করা হয়।

আর এই Sale Deed এর মধ্যে দিয়েই দলিলে মালিকানা হক একজনের নাম থেকে অন্য জনের নামে স্থান্তরিত হয়ে যায়।

এভাবে দলিল বা সেল ডিড এর মধ্যে দিয়ে মালিকানা হকের পরিবর্তন নিয়ে রেজিস্টারের কাছে রেজিস্ট্রি হয়ে গেলেও,সরকারি রেভিনিউ রেকর্ডে কিন্তু জমির আগের মালিকের নামই রেজিস্টার হয়ে থাকে।

তাই সরকারি খাতায় নামজারী করার জন্য (Government Revenue Record) বিশেষ করে কৃষি জমির ক্ষেত্রে জমির মালিকানা হক পরিবর্তনের দরকার হয়।

সরকারি খাতায় (Government Revenue Record) জমির মালিকানা হকের নাম পরিবর্তনের এই পক্রিয়াকেই জমির রেকর্ড বা নামজারী করা (Plot Mutation) বলা হয়ে থাকে।

জমির রেকর্ড করার পক্রিয়া ০২ টি জায়গায় সম্পূর্ণ হয়ে থাকে। যেমন- ০১. রেভিনিউ রেকর্ড,০২. মিউনিসিপাল বডি। 

আরো পড়ুন : ঘোষণাপত্র দলিলের গুরুত্ব কি ?

জমির মালিকানা হক ট্রান্সফার কি কি কারণে দরকার হয়  


আপনারা জানেন যে সাধারণভাবে স্ট্যাম্প শুল্ক (Stamp Duty) দেওয়ার প্রয়োজন হয় মালিকানা হক পরিবর্তনের জন্য। কিন্তু তার সাথে এটাও জানা দরকার,

ঠিক কি কি কারণে মালিকানা হকের পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়। আসুন একনজরে দেখে নেওয়া যাক মালিকানা হক পরিবর্তনের সাথে সেল ডিড ঠিক কি কি কারণে পরিবর্তন করা হয়-

০১. বিক্রয়ের জন্য – একজন জমির মালিক যখন তার নিজের প্রয়োজনে যখন আর একজনের কাছে জমি বিক্রয় করতে চায় তখন

জমির মালিককে তার নিজের নাম থেকে অন্য জনের নামে মালিকানা হক ট্রান্সফার করার জন্য সেল ডিড এর মাধ্যমে মালিকানা হক পরিবর্তনের দরকার হয়।

০২. উপহার স্বরূপ- যখন কেউ কাউকে কোনো জমি বা বিষয় সম্পত্তি উপহার হিসাবে দিতে চায়,তখন সেল ডিড এর প্রয়োজন হয়।

০৩. উত্তরিধিকারী সূত্রে- যখন জমির মালিক মারা যায় তখন তার উত্তরাধিকারী আত্মীয় স্বজনদের নামে জমির মালিকানা হক ট্রান্সফারের জন্য সেল ডিড (Stamp Duty) দেওয়ার প্রয়োজন হয়।

০৪. অগ্রিম কারো নামে উইল করার জন্য- যদি কোনো ব্যক্তি তার যাবতীয় বিষয় সম্পত্তি তার মৃত্যুর পূর্বে কোন ব্যক্তির নামে করে দিয়ে যেতে চায় তার জন্য সেল ডিড এর প্রয়োজন হয়।

০৫. জমি জমার বদলা-বদলি করার জন্য- যখন কোনো দুই জন্য ব্যক্তি তাদের জমি বা জায়গা একে অপরের সাথে বদলা বদলি করে নিতে চায় তখন সেক্ষেত্রে সেল ডিড এর প্রয়োজন হয়।

০৬. নামান্তর (Transfer Deed)- সাধারণ ভাবে কোনো ব্যক্তি তার বিষয় সম্পত্তি যখন অন্য কারো নামে লিখে দিতে চায় তখন সেক্ষেত্রেও সেল ডিড এর প্রয়োজন হয়।

আমাদের দেশে সাধারণত দুই ধরনের জমি বা জায়গার কেনা বেচা হয়ে থাকে- ০১. কৃষি জমি,০২.নির্মিত সম্পত্তি (বাড়ি,ঘর,দোকান)

০১. কৃষি জমি (Agriculture Property)-
  • কৃষি জমি ক্রয় বিক্রয় করার আগে সবার প্রথমে একটি জমি পছন্দ করা হয়।
  • তারপর ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে জমির দাম নির্ধারণ হয়।
  • এরপর জমির এগ্রিমেন্ট পেপারে জমির ক্রেতা ও বিক্রেতা সহ স্বাক্ষীর সই স্বাক্ষর করা হয়। এগ্রিমেন্ট পেপারে জমির মোট দাম,কত টাকা এডভান্স করা হল তার পরিমান ইত্যাদি লেখা হয়।
  • এরপরের ধাপে সাব রেজিস্টার অফিসে গিয়ে জমির সেল ডিড তৈরী করে রেজিস্ট্রি প্রসেস পুরো করা হয়।
  • সর্বশেষ ধাপ হল কৃষি জমির ক্ষেত্রে BLRO Office এ গিয়ে জমির রেকর্ড মানে জমির রেভিনিউ রেকর্ডে (Plot mutation) আগের নাম পরিবর্তন করে বর্তমান মালিকের নাম নথিভুক্ত করা।
০২. নির্মিত সম্পত্তি (বাড়ি,ঘর,দোকান)-
  • এই ধরণের সম্পত্তিতে একই ভাবে ক্রেতা বিক্রেতার নির্মিত জায়গা অথাৎ যেটা বিক্রি করতে চাইছে যেমন- বাড়ি কিংবা দোকান সেটা পছন্দ করে।
  • তারপর ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে দর দাম স্থির হয়।
  • এরপর এগ্রিমেন্ট প্রসেস পুরো করা হয়।
  • তারপর ফুল এবং ফাইনাল প্রসেস সম্পূর্ণ হয় সাব রেজিস্টার অফিসে গিয়ে সেল ডিড লিখে রেজিস্ট্রি পক্রিয়া পুরো হওয়ার পর।
  • এই ধরণের নির্মিত সম্পত্তি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে শুধু মাত্র মিউনিসিপাল বডি অফিসে গিয়ে নির্মিত সম্পত্তির পূর্বের মালিকের নামে ট্যাক্স দাতার জায়গায় সম্পত্তির নতুন মালিকের নামে Property Tax আদায়ের জন্য নাম নথিভুক্ত করা হয়।

আরো পড়ুন : কেমন হবে ভারতের নতুন সংসদ ভবন। 

জমির রেকর্ড কি


জমির রেকর্ড কি বলতে যেটা বোঝাই-যখন কোনো বিক্রেতা কোনো ক্রেতার কাছে তার জমি (চাষ জমি) বিক্রয় করে তখন যেমন জমির সেল ডিড (দলিলে),

যেমন মালিকানা হক রেজিস্টারের কাছে গিয়ে পরিবর্তন করা হয়। ঠিক তেমনি সরকারি রেভিনিউ রেকর্ডে একই ভাবে জমির পুরোনো মালিকের নাম পরিবর্তন করে

জমির রেকর্ড কি
জমির রেকর্ড কি

জমির নতুন মালিকের নাম নথিভুক্ত করার দরকার হয়। আর যতক্ষণ পর্যন্ত জমির রেকর্ড করার পক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় ততক্ষন পর্যন্ত বিশেষ করে চাষ জমির ক্ষেত্রে শুধু দলিলকেই জমির

ফাইনাল ডকুমেন্ট হিসাবে ধরে নেওয়া হয়না। এখানে দলিলের থেকে অধিক জমির রেকর্ড বা নামজারী যার নামে আছে তাকেই জমির আসল মালিক হিসাবে মান্যতা দেওয়া হয়।

আরো পড়ুন : স্ট্যাম্প শুল্ক (Stamp Duty) আসলে কি ? স্ট্যাম্প শুল্ক ক্যালকুলেট করার নিয়ম। 

 জমির রেকর্ড সংশোধন করা কেন জরুরী


নামজারী বা জমির রেকর্ড সংশোধন করা কেন জরুরী তার পিছনে যথেষ্ট যুক্তি আছে –

০১. কৃষি জমির (চাষ যোগ্য জমি)ক্ষেত্রে সেল ডিড অথাৎ জমির দলিল ফাইনাল ডকুমেন্ট নয়,এক্ষেত্রে জমির রেকর্ড-ই হল জমির ফাইনাল ডকুমেন্ট।

০২. জমি জমা সংক্রান্ত বাটপারি থেকে বাঁচার জন্য জমির রেকর্ড করাটা খুব জরুরী। বিশেষ করে কৃষি জমির ক্ষেত্রে জমি বিক্রি হওয়ার পর, যদি সরকারি রেভিনিউ রেকর্ডে

BLRO Office এ জমির ক্রেতা যদি জমির পুরোনো মালিকের নাম পরিবর্তন না করে থাকে তাহলে আইনত ভাবে জমির পুরোনো মালিককেই বিক্রীত জমির আসল মালিক হিসাবে ধরা হবে।

এক্ষেত্রে পুরোনো মালিক চাইলে তার জমি দ্বিতীয় বার অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দিতে পারে,তাই আপনারা  চাষ যোগ্য জমি কেনার আগে

জমির দলিলের সাথে নামজারী অথাৎ জমির রেকর্ড দেখে নিন। জমি রেজিস্ট্রি হওয়ার পর জমির নামজারী বা জমির রেকর্ড নিজের নামে করে নিন,নইলে ভবিষ্যতে ঝামেলার সম্মুখীন হয়তো হতে হবে।

০৩. চাষ জমিতে বিভিন্ন সময় Government Compensation হিসাবে বিভিন্ন Subsidy দেওয়া হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে জমির পর্চা অথাৎ জমির রেকর্ড যার নামে থাকবে সেই ব্যক্তি সমস্ত সুবিধা পাবে।

যেমন – কিষান সম্মান নিধি যোজনার আওতায় বছরে ৬০০০ টাকা করে দুই কিস্তিতে ১২০০০ টাকা এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষক বন্ধু প্রকল্পে একই ভাবে ১০০০০ টাকা পাওয়া যায়।

নোট – নির্মিত সম্পত্তি (Build Property) এর ক্ষেত্রে শুধু মাত্র মিউনিসিপাল বডিতে গিয়ে Property Tax দেওয়ার জন্য পুরোনো মালিকের জায়গায় নতুন মালিকের নাম নথিভুক্তের প্রয়োজন হয়।

জমির রেকর্ড করতে কি কি লাগে


জমির রেকর্ড করতে যে সমস্ত নথি গুলোর প্রয়োজন হয় সেগুলি হল –

০১. জমির দলীল অথাৎ Register Sale Deed Copy (Will Deed//Gift Deed/Transfer Deed) ইত্যাদি নামজারী বা জমির রেকর্ড করার জন্য দরকার হয়।

০২. জমি রেকর্ড করার জন্য,জমি রেকর্ডের ফর্ম (Plot Mutation From) এর প্রয়োজন। জমি রেকর্ডের ফর্ম আপনি BLRO অফিসে পেয়ে যাবেন।

০৩. জমির রেকর্ড এর জন্য Stamp Paper এর উপর Identity Bond এর দরকার হয়।

০৪. জমির রেকর্ডের জন্য Court এর Affidavit Certificate এর দরকার হয়।

০৫. যদি নির্মিত সম্পত্তি (যেমন – বাড়ি,ঘর) হয় তাহলে Property Tax এর Receipt এর দরকার হয়।

০৬. যদি আপনি সম্পত্তি কারো কাছ থেকে উত্তরিধিকারী সূত্রে (Legal Inheritance) পেয়ে থাকেন তাহলে সেই সম্পত্তির নামজারী বা রেকর্ড করাতে হলে Ex Owner Death Certificate এর প্রয়োজন হয়।

০৭. কোনো ব্যক্তি যদি তার সম্পত্তির অগ্রিম উইল কারো নামে করে যায়,সেক্ষেত্রে সম্পত্তির উইলের(Will) এর একটি জেরক্স কপি Attested Copy (প্রত্যায়িত সই সহ) প্রয়োজন হয়।

০৮. কোনো ব্যক্তি তার বিষয় সম্পত্তির Power of Attorney কারো নামে করে যায় এবং সেক্ষেত্রে ঐ সম্পত্তির রেকর্ড করার জন্য Power of Attorney এর Attested Copy (প্রত্যায়িত সই সহ) প্রয়োজন হয়।

আরো পড়ুন : পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষক বন্ধু প্রকল্পের টাকা কিভাবে পাবেন। 

পরিশিষ্ট


আশাকরি আপনারা এতক্ষনে নামজারী বা জমির রেকর্ড কি,জমির রেকর্ড কাকে বলে,জমি রেকর্ড করার নিয়ম,জমির রেকর্ড সংশোধন করা জরুরী কেন ? পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন।

তাই আপনাদের কাছে নিবেদন যারা কৃষিজমি কিনেছেন তারা নিশ্চয় বুঝে গেছেন নামজারী বা জমির রেকর্ড কি জিনিস। তাই জমির রেকর্ড কিভাবে করতে হবে ?

জমি রেকর্ড কিসের জন্য করব না ভেবে নিজের জমির রেকর্ড অতি অবশ্যই করিয়ে নিন। কারণ আদালত শুধু জমি রেজিস্ট্রির মাধ্যমে,

মালিকানা হক ট্রান্সফারকে ফাইনাল ডকুমেন্ট হিসাবে অনুমোদন দেয় না আদালতের কাছে আইনের দৃষ্টিতে জমির রেকর্ড হল,

কৃষি জমির ফাইনাল ডকুমেন্ট,তাই একজন দায়িত্ববান নাগরিক হিসাবে আজই আপনার জমির রেকর্ড করিয়ে নিন। ধন্যবাদ

এই আর্টিকেল গুলোও পড়ে দেখুন –