পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড (Purulia arms drop documentary)

আজকে আমরা আলোচনা করব পশ্চিম বঙ্গের একটি অন্যতম অন্ধকারচ্ছন্ন রহস্যময় ঘটনা পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড (Purulia arms drop documentary) নিয়ে।

আপনারা সকলেই হয়ত কম বেশি পশ্চিমবঙ্গের পাশবর্তী রাজ্য ঝাড়খন্ড লাগোয়া জেলা পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড সমন্ধে শুনে থাকবেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস যদিও আপনারা পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড

সম্পর্কে লোকমুখে শুনে থাকলেও আসল ঘটনাটি সম্পর্কে সবাই অবগত না হতেও পারেন। যদিও পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ডের মত ঘটনা তখনকার মানুষের মনে একটা কৌতূহল সৃষ্টি করেছিল ঠিকই,

কিন্তু আপনারা জানলে অবাক হবেন আজও তা কৌতুহল হয়েই রয়েই গেছে ? কারা বা কে,কেন পুরুলিয়ায় হাতিয়ার ফেলেছিল আজও তা রহস্য হয়েই রয়েই গেছে।

পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড (Purulia arms drop case) 


পুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী ঝাড়খন্ড রাজ্য লাগোয়া একটি জেলা। পুরুলিয়ার ছৌ-নাচ,পাহাড় ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সবারই মন কারে।

১৯৯৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর ভোর বেলা গ্রামের কিছু মানুষ প্রতিদিনের ন্যায় মাঠে কোদাল,কাস্তে নিয়ে খেতে কাজ করার জন্য গেছিল।

কিন্তু প্রতিদিনের মত মাঠের রাস্তা ঘাট একই রকম হলেও তারা খেতের জমিতে গিয়ে নতুন নতুন বড় বড় কাঠের বাক্স দেখতে পেল।

খেতের মধ্যে মধ্যে পড়ে থাকা বড় বড় কাঠের বাক্স দেখে চাষিদের মনে কৌতূহল জাগে। কৌতূহল বসে চাষীরা  বাক্স খুললে,বাক্স ভর্তি আগ্নেয়াস্ত্রে দেখতে পায়।

খবর বাতাসের মত আশে পাশের গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে,মাঠের মধ্যে কাকতালীয়ভাবে আগেয়াস্ত্র ভর্তি বাক্স দেখে গ্রাম বাসীরা হতবাক হয়ে যায়। এরপর চলে হাতিয়ারের হরিলুট।

চাষীরা মাঠে গিয়ে ঝোপ ঝাড় যেখানেই খোঁজে বড় বড় হাতিয়ার ভর্তি কাঠের বাক্স দেখতে পায়। যে যার মত করে কাঁধে বগলে করে হাতিয়ার নিয়ে দৌড় লাগায়।

খবর যতক্ষনে প্রশাসনের কাছে পৌঁছায় তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে,গ্রামবাসী যে যতটা পেরেছে ধন দৌলতের ন্যায় হাতিয়ার লুট করে নিয়ে চলে গেছে।

ঘটনার গুরুত্ববুঝে পুলিশ ঘটনা স্থলে এসে পৌঁছায়,পরিস্থিতি উদ্বিগ্ন দেখে খবর রাজ্য থেকে কেন্দ্রের উচ্চ প্রশাসন অব্ধি পৌঁছায়।

পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড
পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড

ঘটনাস্থলে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW,IB সহ বিভিন্ন বিভিন্ন সিক্রেট সার্ভিস এর এজেন্টরা এসে পৌঁছায়। সারাভারত জুড়ে হাই এলার্ট জারী করার মত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ডের তদন্ত করার জন্য স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের টিম তৈরী করা হয়। টাস্ক ফোর্সের টিম এসে পুরুলিয়ার বিভিন্ন গ্রাম গুলিতে সার্চ অপারেশন করে অনেক আগ্নেয়াস্ত্র বাজেয়াপ্ত করে।

পুলিশ মাইকিং করে গ্রামবাসীদের কাছে হাতিয়ার পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার আর্জি জানায় “বে-আইনি ভাবে হাতিয়ার রাখা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ “,

এরপর গ্রামবাসীরা একে একে লুট করা হাতিয়ার পুলিশের কাছে স্যারেন্ডার করে দেয়। পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী গ্রামবাসীদের কাছ থেকে ৩০০ খানা একে ৪৭ রাইফেল,

১৫,০০০ হাজারের কাছাকাছি কার্তুজ,০৬ খানা রকেট লঞ্চার,নাইট ভিজন ক্যামেরা, ০৯ এম.এম পিস্তল এবং বিপুল পরিমানে হ্যান্ড গ্রেনেট উদ্ধার করা হয়।

আরো পড়ুন : আন্দামানের কালাপানি সেলুলার জেলের ইতিহাস। 

Purulia arms drop case study (পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ডে পুলিশি অনুসন্ধান )


পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রতন্ত গ্রামে পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ডের মত কাকতালীয় ঘটনা সাধারণ মানুষের কাছে ছিল অলৌকিক একটা ব্যাপার।

মাঠে কাজ করতে গিয়ে খেতের মধ্যে বাক্স ভর্তি আগ্নেয়াস্ত্রের দেখা পাওয়া ছিল অনেকটা মাঠের মধ্যে চাষির গুপ্ত ধন পাওয়ার ঘটনার মত।

চাষিরা কিংকর্তব্যবিমূঢ হয়ে হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে তারা ঠিক ভালোমন্দ ঠাওর করার মত অবস্থায় ছিল না,এমনকি তারা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে এতবড় একটা ঘটনার সূচনা দেওয়ার প্রয়োজন বোধ পর্যন্ত মনে করেনি।

পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের মাধ্যমে জানতে পারে সকালবেলা খেতের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে হাতিয়ার ভর্তি কাঠের বাক্স গ্রামবাসীর হাত লাগে।

তাছাড়া গ্রামের মেঠো রাস্তা ছোট,ছোট জমির আল দিয়ে হাতিয়ার বন্দি ভারী ভারী বাক্স অন্যকারো দ্বারা ফেলে দিয়ে আসার কোনো যুক্তি পুলিশ খুঁজে পায়নি।

তাই পুলিশ আনুমানিক ভাবে মনে করে নেয় সম্ভবত কারো দ্বারা বিমান থেকেই পুরুলিয়ার প্রতন্ত গ্রামে হাতিয়ার ফেলে দেওয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন : বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল এর রহস্য সমাধান। 

Purulia arms drop truth (পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ডের সত্যতা )


পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানের পর পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড মামলা (Purulia arms drop case) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা CBI কে দিয়ে দেওয়া হয়।

CBI তদন্তে নেমে পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ডে নতুন মোর নিয়ে আসে। CBI তার তদন্তে জানায় ১৭ ডিসেম্বর পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড ঘটে যাওয়ার তিন দিন পরে

বোম্বাইয়ের আকাশে একটি বিমানকে সন্দেহপ্রবন ভাবে আকাশে উড়তে দেখা যায়। বোম্বাই এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম অজানা সন্দেহ জনক বিমানটিকে ট্রেস করে।

এরপর ভারতীয় বায়ুসেনার তৎপরতায় মিগ-২১ ফাইটার বিমান দ্বারা সন্দেহ প্রবন বিমানটিকে বোম্বাই এয়ারপোর্টে ল্যান্ডিং করানো হয়।

বিমানটিতে চালকসহ মোট ০৮ জন যাত্রী ছিল,তাদের মধ্যে ০৭ জনকে গ্রেফতার করা হয় বাকি ০১ জন পালিয়ে যায়।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসে। এবারে সবার সামনে জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় এই বিমানই সেই বিমান,

যে বিমান থেকে পুরুলিয়ায় হাতিয়ার ড্রপ (Purulia arms drop) করা হয়েছিল। এই ঘটনা রাতারাতি খবরের হেড লাইন হয়ে যায়।

ধৃত ০৭ জনের মধ্যে ০৬ জন ছিলেন লাটবিয়ার নাগরিক,পরে অবশ্য তারা সকলেই রাশিয়ার নাগরিকত্ব পেয়ে যায়। আর বাকী একজন ছিলেন ব্রিটেনের নাগরিক।

ব্রিটেনের লোকটির নাম ছিল পিটার ব্লিচ,যিনি পেশায় ছিলেন একজন বড় মাপের হাতিয়ারের ডিলার এবং তিনি পরোক্ষভাবে ব্রিটেনের গুপ্তচর এজেন্সি MI-V এর এজেন্ট ছিলেন।

পালিয়ে যাওয়া ০৮ নং ব্যক্তিটি ছিলেন পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ডের (Purulia arms drop case) মাস্টার মাইন্ড কিম ডেভি (Kim Davy),ইনি ছিলেন ড্রেনমার্কের নাগরিক।

পিটার ব্লিচকে জেরা করে পুলিশ জানতে পারে পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ডের হাতিয়ারের ডেলিভারি দেওয়ার কথা ছিল আনন্দমার্গ নামক এক ধার্মিক সংগঠনকে,

কিন্তু পাইলট ঠিক মত লোকেশন ট্রাক করতে না পারায় সেটা ভুলবশতঃ পুরুলিয়ায় ড্রপ করে দেওয়া হয়। তাছাড়া একটা প্রশ্ন এও ছিল যে পশ্চিমবঙ্গে

তখন শাসকদল হিসাবে লেফট পার্টির সরকার আনন্দমার্গ নামের ধর্মীয় সংগঠনের সাধুদের উপর অত্যাচার করত,তাই তাদের বাধ্য হয়েই হাতিয়ার তুলে নিয়েছিল।

তখন তাদের কাছে প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল যেকোনো প্রকারে পশ্চিমবঙ্গ থেকে লেফট পার্টির সরকারকে শিকড় থেকে উপরে ভূমিসাৎ করে দেওয়া।

পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড
পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড

পিটার ব্লিচের বয়ান অনুযায়ী পুলিশের হাতে যে পরিমান হাতিয়ার হাত লেগেছিল তা সংখ্যায় অনেকটাই কম ছিল,বাকি হাতিয়ার আনন্দমার্গ সংগঠনের লোকেরা নিয়ে পালিয়েছিল বলে মনে করা হয়।

পিটার ব্লিচ এও বলেন যে কিম ডেভি (Kim Davy) তাকে বোম্বাই এয়ারপোর্ট থেকে তার সাথে পালিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছিল,কিন্তু সে নিজের ইচ্ছাতেই পুলিশের কাছে ধরা দিয়েছে।

তার মতে পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড ঘটনা আগে থেকেই পূর্ব পরিকল্পিত ছিল,আর একজন হাতিয়ারের ডিলার হিসাবে তার দায়িত্ব ছিল সময়মত ঠিক জায়গায় হাতিয়ার ডেলিভারি দেওয়া।

তিনি একজন MI-V এর এজেন্ট হিসাবে এই ঘটনার পূর্ব সূচনা ব্রিটেন সরকার ও MI-V কে জানিয়েছিলেন এবং পরে MI-V,হাতিয়ার কান্ডের সূচনা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW কে দিয়েছিল।

তাই পিটার ব্লিচের বিশ্বাস ছিল তাকে পুলিশ দ্বারা গ্রেফতার করা হলেও যেহেতু ঘটনার পূর্ব সূচনা সবাইকে দেওয়া আছে তাই তাকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও ব্রিটেন সরকার তাকে ঠিক ছাড়িয়ে নেবে।

এরপর CBI ব্রিটেনের MI-V এর সঙ্গে যোগাযোগ করে,কিন্তু ব্রিটেনের গুপ্তচর সংস্থা MI-V, পিটার ব্লিচকে  তাদের এজেন্ট মানতে অস্বীকার করে,তারা বলে দেয় পিটার ব্লিচ নামে তাদের কোনো এজেন্ট নেই ।

আরো পড়ুন : ইন্ডিয়া গেট নির্মাণের ইতিহাস। 

পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড যে ভাবে করা হয়েছিল


পুরুলিয়াতে যে বিমানটি থেকে হাতিয়ার ড্রপ করা হয়েছিল সেটা ছিল রাশিয়া দ্বারা নির্মিত পণ্যবাহী বিমান। বিমানটি প্রথমে বুলগেরিয়া থেকে হাতিয়ার কেনার পর উড়ান ভরে

বিমানটি আকাশপথে তুর্কীতে পৌঁছায়। তারপর ইরান হয়ে পাকিস্তানের করাচীতে ল্যান্ড করে। করাচী থেকে বিমানটি ভারতের আকাশ সীমানায় প্রবেশ করে বেনারস এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করে।

বেনারসে বিমানটিকে ০৮ ঘন্টা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। তারপর বেনারস এয়ারপোর্টে ফিউল লোড করার পর বিমানটি উড়ান ভরে পশ্চিমবঙ্গের আকাশ সীমানায় প্রবেশ করে।

পশ্চিমবঙ্গের সীমানায় প্রবেশ করে পুরুলিয়ার কাছে এসে প্যারাসুটের সাথে হাতিয়ার ভর্তি বাক্স গুলো মাটিতে ড্রপ করে দেওয়া হয়।

হাতিয়ার ড্রপ করে বিমানটি কলকাতার দমদম এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছায়,সেখান থেকে উড়ান ভরার পর বিমানটি থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্য রওনা দেয়।

থাইল্যান্ড থেকে বিমানটি আবার নতুন করে পাকিস্তানের করাচী পৌঁছায়,করাচী থেকে বিমানটি ইউ টার্ন নিয়ে  ভারতীয় আকাশ সীমানায় প্রবেশ করলে বায়ুসেনার মিগ-২১ বিমান বিমানটিকে বোম্বাইয়ে অবতরণ করেন।

আরো পড়ুন : তিব্বতিয়ান ধর্মগুরু দলাই লামার জীবনী। 

পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ডে CBI এর রিপোর্ট ও অন্যান্য মতভেদ


পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ডের খসড়া রিপোর্ট CBI আদালতে পেস করে,তদন্তের রিপোর্টে CBI স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড করা হয়েছিল মূলত আনন্দমার্গ নামের ধর্মীয় সংগঠনের জন্য।

CBI তার রিপোর্টে সাফাই দিয়ে জানিয়ে দেয় ১৯৮২ সালের ৩০ শে এপ্রিল আনন্দমার্গ সংগঠনের ১৬ জন সাধু এবং ০১ জন সাধ্বী সহ তারা কলকাতায় একটি শিক্ষা সমাবেশে অংশ গ্রহণের জন্য যাচ্ছিলেন।

পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড
পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড

কিন্তু কলকাতায় বিজন সেতুর কাছে ১৬ জন সাধু সহ তাদের সঙ্গে ঐ সাধ্বীকে পেটানোর পর আগুন জ্বালিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়,এই ঘটনা ইতিহাসের পাতায় বিজন সেতু হত্যাকান্ড নামে পরিচিত।

কিন্তু তৎকালীন পচিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসীন লেফট সরকার অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো রকম আইনত পদক্ষেপ নেয়নি।

তাই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে লেফট সরকারকে শিকড় থেকে উপরে ফেলে দিতে চেয়েছিল আনন্দমার্গের অনুগামীরা সেই জন্যই আনন্দমার্গের অনুগামীদের জন্য

পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড করানো হয়েছিল। তাছাড়া অপরদিকে পুরুলিয়া ছিল আনন্দমার্গ ধার্মিক সংগঠনের হেড কোয়াটার তাই পুরুলিয়াতে হাতিয়ার ড্রপ করানো একটা মুখ্য কারণ ছিল বলে মনে করা হয়।

আবার কারো কারো মতে সমস্ত হাতিয়ার বরাদ্দ ছিল বাংলাদেশি কোনো উগ্রবাদী গ্রূপের জন্য,কিন্তু বিমানের পাইলট আকাশ থেকে ঠিকমত লোকেশন ট্র্যাক করতে না পারায়,

পাইলট ভুলবশত পুরুলিয়াকে বাংলাদেশ ভেবে সেখানেই হাতিয়ার ড্রপ করিয়ে দেয়। আবার কারো কারো মতে এই সমস্ত ঘটনার মুলে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা CIA এর হাত ছিল বলে মনে করেন।

CIA এই সমস্ত হাতিয়ার মায়ানমারের কাচেন বিদ্রদ্রোহীদের দিতে চেয়েছিলেন,কিন্তু ভুলবশতঃ সেই হাতিয়ার মায়ানমারে ড্রপ না হয়ে পুরুলিয়ায় ড্রপ হয়ে যায়।

পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড নিয়ে আর একটি মত এও আছে যে পুরুলিয়ায় হাতিয়ার ড্রপ করা হয়েছিল শ্রীলংকার উগ্রবাদী সংগঠন LTTE প্রধান প্রভাকরমের জন্য।

আরো পড়ুন : সেরা ৫০ টি প্রেমিক ও প্রেমিকার মজাদার জোকস। 

পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড ও আদালতের রায় (Purulia arms drop case Court judgement)


পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড মামলায় CBI এর আনন্দমার্গের বিরুদ্ধে দেওয়া সমস্ত রিপোর্ট তথ্য ও প্রমানের অভাবে খারিজ করে দেয়। 

আর যে সমস্ত ০৭ জন অপরাধীকে পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল তাদের সবাইকে ১৪ বছরের যাবজীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়।

কিন্তু আন্তর্জাতিক মহলে রাশিয়া ভারতের এগেনেস্টে প্রেসার তৈরি করলে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ০৬ জন লাটবিয়ান নাগরিককের সাজা মাফ করে দেওয়া হয়।

২০০৪ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে এলে রাষ্ট্রপতি দ্বারা পিটার ব্লিচের সাজা মাফ করে দেওয়া হয়। এরপর পিটার ব্লিচ তার দেশে ফিরে চলে যায়।

purulia arms drop
purulia arms drop

বাকি ছিল পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ডের মূল মাস্টার মাইন্ড কিম ডেভি তাকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি,সে ধরা পড়ার ভয়েই বোম্বাই এয়ারপোর্ট থেকে নেপাল হয়ে ড্রেনমার্কে পালিয়ে গেছিল।

২০১০ সালে ভারত সরকারের সহযোগিতায় CBI কিম ডেভিকে ভারতে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য নিয়ে আসার প্রয়াস করে,কিন্তু ড্রেনমার্কের সরকার

কিম ডেভিকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার আগে ভারতের সামনে ০২ টি শর্ত রাখে- ০১) ভারত কিম ডেভিকে দোষী হিসাবে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিতে পারবেনা,

০২) কিম ডেভিকে দোষী ধরে যদি কোনো সাজা দেওয়া হয় তবে তার সাজা কিম ডেভি তার নিজের দেশ ড্রেনমার্কে সাজা কাটবে।

সমস্ত শর্ত মেনে কিম ডেভিকে ভারতে নিয়ে আসার রাস্তা প্রস্তুত হওয়ার আগে কিম ডেভি ড্রেনমার্কের হাইকোর্টে পিটিশন দিয়ে দেয়

ড্রেনমার্ক আদালত পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড ঘটে যাওয়ার ১৫ বছর পরে ভারত সরকার কিম ডেভিকে নতুন করে ভারতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনায় স্টে অর্ডার দিয়ে দেয়।

যার ফলে কিম ডেভিকে পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য CBI এর আর ভারতে নিয়ে আসা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

আরো পড়ুন : স্ট্যাম্প ডিউটি কি ?

পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড নিয়ে কিছু অনন্ত জিজ্ঞাসা ?


পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড (Purulia arms drop case) ঘটনায় সাধারণ মানুষের মনে কিছু প্রশ্ন সর্বদা ঘুর পাক কাটে,যে প্রশ্ন গুলোর জবাব মানুষ আজও পায়নি। 

০১. পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড ঘটে যায় ১৯৯৫ সালে অথচ CBI পুরো ঘটনার মাস্টার মাইন্ড কিম ডেভিকে ভারতে নিয়ে এসে জিজ্ঞসাবাদ করার চেষ্টা ২০১০ সালে

করতে দেখা যায়,তাহলে এতদিন কেন CBI কিংবা ভারত সরকার কিম ডেভিকে ভারতে নিয়ে আসার চেষ্টা কেন করেনি ? আর যদি চেষ্টা করেছিল তাহলে সেই চেষ্টাই কি ত্রুটি ছিল ?

০২. ড্রেনমার্ক হাইকোর্ট কিম ডেভিকে ভারতে নিয়ে আসার জন্য স্টে অর্ডার দিয়ে দিলেও ভারত সরকার চাইলে ড্রেনমার্কের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে পারতো কিন্তু ভারত সরকার কেন সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়নি ?

০৩. ২০১১ সালে তৎকালীন ভারতের Times Now খবর চ্যানেলের নিউজ আঙ্কোর অর্ণব গোস্বামী কিম ডেভির সাথে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে একটা মিডিয়া সাক্ষাৎ নেয়।

সেই সাক্ষাতে কিম ডেভি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন তাকে ভারত থেকে ড্রেনমার্ক পালানোর জন্য তৎকালীন CBI ডেপুটি ডাইরেক্টর জে.কে দত্ত এবং বিহারের পূর্ণিয়ার সংসদ পাপ্পূ যাদব তাকে নেপালের রাস্তা দিয়ে

ড্রেনমার্ক পালাতে সাহায্য করেছিল। এইসব ঘটনা দেখে শুনে স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের মনে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক সরকার কি সত্যিই কিছু জানতনা ? না সব কিছু জেনেও না জানার ভান করছিল সরকার ?

০৪. CBI এর Ex Director যোগিন্দর সিং পুরো ঘটনার তদন্ত করতে চাইলে তৎকালীন কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও এর মন্ত্রিসভা ঘটনার তদন্ত ভার যোগিন্দর সিংকে দিতে কেন মানা করে দিয়েছিল ?

০৫. ১৯৯৫ সালের ১৭ ই ডিসেম্বর যখন পুরুলিয়ার, যে গ্রামে বিমান থেকে হাতিয়ার ফেলা হচ্ছিল,তার অনতি দূরে ভারতীয় বায়ুসেনার কলাইকুন্ডা এয়ারবেস ছিল,

এখন প্রশ্ন হল কলাই কুন্ডা এয়ারবেসের বায়ুসেনার রাডার সিস্টেম সহজেই অপরিচিত হাতিয়ার বাহী বিমানটিকে ট্রেস করতে পারত।

কিন্তু ভারতীয় বায়ুসেনা তাদের দেওয়া বিবৃতিতে কোর্টকে জানিয়ে দেন সেইদিন তাদের কলাই কুন্ডা এয়ারবেসের সমস্ত রাডার সিস্টেম মেন্টেনেন্সের জন্য বন্ধ করে রাখা হয়েছিল।

ভারতীয় বায়ুসেনার কাকতালীয় ভাবে একসাথে সব রাডার সিস্টেম মেনটেন্সের অজুহাতে বন্ধ রাখা ঠিক যেন হজম হয় না।

০৬. আবার RAW এজেন্টেদের দাবি RAW মারফৎ পুরুলিয়া হাতিয়ার ঘটনার খবর কেন্দ্র সরকারকে দেওয়া হয়েছিল। তারপর হোম মিনিস্টি থেকে এই ঘটনার খবর রেজিষ্টি ডাকের মাধ্যমে

পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হোম মিনিস্টি থেকে পাঠানো সেই চিঠি পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড ঘটে যাওয়ার অনেক পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হাতে এসে পৌঁছায়।

এখন প্রশ্ন হল এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি খবর হোম মিনিস্টি সরাসরি রাজ্য সরকারকে না জানিয়ে রেজিষ্টি ডাকে কেন পাঠাল ?

০৭. ভারতবর্ষে RTI এর মত কঠোর আইন থাকতেও কেন সরকার রাষ্ট্র সুরক্ষার দায় দিয়ে পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ডের সত্যতাকে গোপন করে রাখতে চাইছে ?

আরো পড়ুন : স্বাস্থ্য বীমা কাকে বলে ? আপনি একটি সেরা স্বাস্থ্য বীমা কিভাবে বাছাই করবেন। 

পরিশিষ্ট


পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড ঘটে গেছে আজ ২৬ বছর হয়ে গেলো কিন্তু আজ পর্যন্ত পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড ঘটনার আসল রহস্য কি আমাদের কাছে অজানা ?

একটা অপরিচিত বিমান ভারতের আকাশ সীমায় প্রবেশ করে বেনারস এয়ারপোর্ট থেকে০৮ ঘন্টা অপেক্ষা করার পর ফিউল লোড করে সেখান থেকে

আবার নতুন করে উড়ান ভরে পশ্চিমবঙ্গের আকাশসীমায় প্রবেশ করা এসব যেন কেমন গোল মেলে ব্যাপার ! সবটা যেন সরকারের কথামত বিশ্বাস করে নেওয়া যায় না।

যাইহোক আজও পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড আমাদের কাছে এক প্রকার ধোঁয়াশাছন্ন হয়েই রয়ে গেছে। পুরুলিয়া হাতিয়ার কান্ড নিয়ে এর থেকে বেশি কিছু তথ্য আর পাওয়া যায়না।