নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি ও রসগোল্লার ইতিহাস।

আজকে আমরা জানব রসগোল্লার কলম্বাস নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি ও রসগোল্লার ইতিহাস নিয়ে কিছু কথা। নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি ও রসগোল্লার ইতিহাস ও

রসগোল্লা আবিষ্কারের গল্প আজ প্রায় ১৫০ বছরের বেশি পুরোনো। যদিও আমাদের বাঙালির শেষ পাতে মিষ্টি হল রসনা তৃপ্তির একটি প্রধান উপাদেয়।

আর সেই মিষ্টির তালিকায় শেষ পাতে যদি রসরাজ রসগোল্লা হয়,তাহলে তো বুঝতেই পারছেন জিভে জল আর তর সয়না। চট করে হাতের তর্জনী ও বৃদ্ধার যৌথ উদ্যোগে,

হালকা করে রস নিচড়ে নিয়ে উর্ধ গগনে মুখটি তুলে,জিহ্বা ও মুখের করুন আপ্পায়নে…হাঁ… করে ঐ…হালুম..উম..উম..,রসগোল্লা ছাড়া বাঙালির ভোজেনেষু সম্পন্ন হবে ভাবা যায় না।

আজকে তাই আপনাদের জন্য নিয়ে এসেছি,রসগোল্লা বাংলার জগৎমাতানো আবিষ্কারের গল্প নিয়ে। আজকে আমরা জানব রসগোল্লার আবিস্কারক কে ? রসগোল্লা কোথায় বিখ্যাত ?

রসগোল্লা কি করে তৈরি হয় ? রসগোল্লা (Rasogolla) কি দিয়ে তৈরি হয় ? রসগোল্লা মিষ্টি নিয়ে কিছু কথা এছাড়াও নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি ও রসগোল্লার ইতিহাস।

নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি ও রসগোল্লার ইতিহাস


নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি ও রসগোল্লার ইতিহাস নিবন্ধটিতে আমরা জানব নবীন চন্দ্র দাস কিভাবে রসগোল্লা (Rasogolla) আবিষ্কার করল সেই রসগোল্লা গল্প।

১৮৬৮ সালে কলকাতার সুনামধন্য মিষ্টির কারিগর ভোলা ময়রার নাতি নবীন চন্দ্র দাস বিখ্যাত স্পঞ্জ রসগোল্লা (Rasogolla) আবিষ্কার করেন।

নবীন ময়রার পিতামহ ভোলা ময়রার আদিবাড়ি ছিল অবিভক্ত ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষের বর্ধমান জেলায়। পরে ভোলা ময়রা ছেলে পুলে নিয়ে,

উত্তর কলকাতার আদি গ্রাম সুতানটি চলে আসেন। (ব্রিটিশরা সুতানটি,গোবিন্দপুর ও কলকাতা গ্রাম নিয়ে কলকাতা শহরের পত্তন করেন)

উত্তর কলকাতায় ভোলা ময়রা একটি  মিষ্টির দোকান খোলেন। ১৮৪৫ সালে নবীন চন্দ্র দাস উত্তর কলকাতায় জন্মগ্রহন করেন। নবীন চন্দ্র দাস জন্ম নেওয়ার ০৩ মাস পরেই নবীন চন্দ্রের বাবা মারা যায়।

নবীন চন্দ্র দাসের বিধবা মা,নবীনকে মানুষ করতে থাকে। কিন্ত নবীন কিশোর অবস্থায় এলে নবীনের মন পড়াশোনার থেকে রান্না বান্নার কাজে বেশি উদগ্রীব হয়ে ওঠে।

নবীনকে পাঠ শালায় রেখে এলে নবীন পাঠশালা থেকে পালিয়ে এসে কাকিমা জেঠিমার সাথে রান্নার জোগানে হাত লাগায়। নবীনের মা ভালোই বুঝতে পারলেন এই ছেলে মা সরস্বতী হইতে বিরূপ।

শেষেমেষ নবীনের মা মনস্থির করে,নবীনকে তার এক দুঃসম্পর্কের আত্মীয় কালী ময়রার দোকানে মিষ্টি তৈরির কাজ শেখার জন্য রেখে এলেন।

নবীন চন্দ্র দাসের প্রথম থেকেই নতুন নতুন রান্না ও মিষ্টি তৈরি করার আগ্রহ ছিল প্রবল। যৌবনকুসুমে পা দিয়ে নবীন ক্ষিরোদমনি নামে একটি মেয়ের সঙ্গে,

প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। নবীনের প্রেমিকা ক্ষিরোদমনি দেবী তার প্রিয় নবীনকে আবদার করে বলে বসলেন,তুমি তো নবীন ময়রা,

তোমার না মিষ্টি তৈরির হাত খুব ভালো। (স্পঞ্জ রসগোল্লা (Rasogolla) আবিষ্কার করার আগে নবীন চন্দ্র দাস -দেদো সন্দেশ,আতা সন্দেশ,আবার খাবো,সন্দেশ,কাস্তোরা ভোগ আদি বিভিন্ন প্রকারের

মিষ্টান্ন তৈরি করে নাম কুড়িয়েছিলেন) তাহলে তোমার এই ক্ষিরোদমনির জন্য এমন একখানা মিষ্টি বানাও দেখি,যে মিষ্টি হবে-

” চটচটে নয়,শুকনো হতে মানা,                                                                                                দেখতে হবে ধবধবে চাঁদ পানা,                                                                                                 এমন মিষ্টি ভূভারতে নাই ,                                                                                                    নবীন ময়রা,এমন মিষ্টি চায়।”

প্রেমিকা ক্ষিরোদমনির শর্ত মেনেই অনেক চেষ্টার পর নবীন চন্দ্র দাস রসগোল্লা (Rasogolla)তৈরি করেছিলেন। পরে যদিও এই রসগোল্লা দুজনকে প্রণয় থেকে,বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেছিল।

আরো পড়ুন: টাইটানিক জাহাজ ডোবার রহস্য। 

রসগোল্লার ইতিহাস (The History of Rasagolla )


নবীন চন্দ্র দাস একদিনে হঠাৎ করে রসগোল্লা (Rasogolla) তৈরি করে ফেলেনি। রসগোল্লা আবিষ্কারের পিছনে নবীনের অনেক পরিশ্রম, রসগোল্লা গল্প কথা ও রসগোল্লার ইতিহাস আছে।

নবীন কালী ময়রার দোকানে প্রিয়তমা ক্ষিরোদমনি দেবীকে দেওয়া কথামত নতুন মিষ্টি আবিষ্কারের নেশায় ব্যস্ত। কিন্তু নতুন মিষ্টি উদ্ভাবনের চেষ্টায় নানা রকম মিষ্টি তৈরির উপাদান নষ্ট হতে থাকলে,

কালী ময়রা আর্থিক ক্ষতির তাচ্ছিলতায় নবীন চন্দ্র দাসকে চাকুরী থেকে নিষ্কাশিত করে দেয়। ময়রার চাকুরী হারিয়ে নবীন বাঁক বাজারের গঙ্গা ঘাটে বসে,খিট খিটে মেজাজে গঙ্গা বক্ষে ঢিল ছুড়ছিলেন।

ঐ বাঁক বাজারের গঙ্গা ঘাটে নবীনের কয়েকটা সিঁড়ির ঠিক নিচের ধাপে বসে,কালী ময়রার দোকানের বয়জৈষ্ঠ নবীনের সহকর্মী ভীম চন্দ্র নাগ,স্নান করার অভিলাষ নিয়ে অর্ধনগ্ন শরীরে,

সর্ষের তেল মালিশ করছিলেন। খিট মেজাজী নবীনকে দেখে ভীম চন্দ্র নাগ বলেই ফেললেন ওহে ছোকরা –      “মনে আর মুখে,মিষ্টি না থাকলে,কি মিষ্টি গড়া যায়।”

ভীম চন্দ্রের এই কথাটি নবীন ময়রার মনে দাগ কাটে। এরপর নবীন ময়রা মায়ের জমানো টাকা নিয়ে ১৮৬৪ সালে নিজের একটি মিষ্টির দোকান খোলেন কলকাতার জোড়াসাঁকোতে।

কিন্তু ব্যবসায়িক দক্ষতা না থাকায় নবীন চন্দ্র দাসের সেই দোকান দীর্ঘস্থায়ী হয়না। খুব অল্প দিনের মধ্যেই নবীন চন্দ্র দাসের জোড়াসাঁকোর মিষ্টির দোকান বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর নবীন চন্দ্র দাস,স্ত্রী ক্ষিরোদমনি দেবীর চেষ্টায় কলকাতার বাঁক বাজারে কালী ময়রার সামনা সামনি নতুন করে ১৮৬৬ সালে একটি মিষ্টির দোকান খোলেন।

নতুন মিষ্টির ব্যবসায়ী নবীন তখন তার পূর্ব আবিষ্কৃত মিষ্টি আতা সন্দেশ,কাঁঠালি সন্দেশ আবার খাবো,কাস্তোরা ভোগ আদি মিষ্টি সহযোগে দোকানের ভীত রাখেন।

কিন্তু একদিকে গিন্নি ক্ষিরোদমনি দেবীর জন্য সাদা ধব ধবে চাঁদ পানা মিষ্টি তৈরির ইচ্ছে,আবার অন্য দিকে কলকাতার বণিক মহলের নবীন ময়রার কাছে ডিমান্ড তেষ্টা ও খিদে দুই মিটবে এমন মিষ্টি বানাতে হবে।

অবশেষে অনেকদিনের চেষ্টায় বিশ্বকর্মা নবীনের মনবাঞ্ছা পূরণ করলেন। একদিন নবীন স্ত্রী ক্ষিরোদমনির সঙ্গে মিষ্টির ছানা সহযোগে কাঁঠালি সন্দেশ তৈরি করছিলেন।

ওড়িষ্যার ক্ষীরমোহন রসগোল্লার জি.আই.ট্যাগ। 1

ক্ষিরোদমনি দেবী দিব্বি সন্দেশ গড়ছিলেন। কিন্তু নবীন আনমনে হাতের তালুতে ছানার দলা পাকিয়ে গোল করছিলেন। ক্ষিরোদমনি ব্যাপারটা লক্ষ করছিলেন,কিন্তু সাহস করে কিছু বলছিলেন না।

কিন্তু স্বামীকে অনেক্ষন এরকম ভাবে অন্যমনস্ক দেখে,থাকতে না পেরে বলেই ফেললেন কিগো এ কি করছো তুমি। নবীন ময়রার ধ্যান ভাঙলো,নবীন তখন হাতের তালুর ছানার গোল্লাটাকে,

পাশের গরম শিরায় ফেলে দিয়ে কাজে মন দিলেন। এদিকে সন্দেশ বানানো হয়ে গেলে, ক্ষিরোদমনির ধ্যান গেলো পাশের গরম কড়ায়ে থাকা সিরার উপর। ক্ষিরোদমনি দেখলেন খুব সুন্দর –

” চটচটে নয়,শুকনো হতে মানা,                                                                                                দেখতে হবে ধবধবে চাঁদ পানা,                                                                                                 এমন মিষ্টি ভূভারতে নাই ,                                                                                                    নবীন ময়রা,এমন মিষ্টি চায়।”

ক্ষিরোদমনি দেবী যেমন চেয়েছিলেন ঠিক সেরকম একটি মিষ্টি নবীন ময়রার হাত দিয়ে,নিজের অজান্তে কখন গরম শিরায় তৈরি হয়ে গেছে। ক্ষিরোদমনি স্বামীকে হাঁক দিলেন ওগো শুনছো–

নবীন ময়রা ক্ষিরোদমনির হাতে নতুন মিষ্টি দেখে সবই বুঝতে পারলেন, আবিষ্কার হয়ে গেলো (Rasogolla) রসগোল্লা। নবীন ময়রা গরম সিরার রসের মধ্যে ছানার গোল্লা পাকিয়ে ফেলেছিলেন,

তাই এই মিষ্টির নাম হয় রসগোল্লা। কিন্তু নবীন চন্দ্র দাস কোনোদিন নিজে রসগোল্লার (Rasogolla) পেটেন্ট নিতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন তার তৈরি রসগোল্লার স্বাদ জগতের লোক নেক।

আরও পড়ুন: ভারতরত্ন কেন দেওয়া হয়। 

রসগোল্লা রেসিপি (Rasogolla Recipe)


নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি ও রসগোল্লার ইতিহাস কারো অজানা নয় তবে নবীন ময়রা নিজে রসগোল্লার পেটেন্ট ধরে না রেখে,

নবীন ময়রা প্রাণ খুলে রসগোল্লা (Rasogolla) কিভাবে তৈরি করতে হয় শিখিয়েছিলেন অন্যান্য প্রতিবেশী ময়রাদের।

নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি বানানো খুব সহজ। শুধু মন দিয়ে রসগোল্লা বানানোর রেসিপি স্টেপ ওয়াইজ ফলো করে খুব সহজে রসগোল্লা বানানো যায়।

নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপিকে আমরা ০৩ টি ধাপে অনুসরণ করে রসগোল্লা বানানোর পদ্ধতি শেখার চেষ্টা করব।

০১. রসগোল্লা বানানোর জন্য মুখ্য বস্তু বা কাঁচা মাল যেগুলো দরকার সেই গুলো প্রথম থেকে হাতের কাছে নিয়ে রেখে দিতে হবে – যেমন ছানা,চিনি,জল,পরিষ্কার সাদা কাপড়,কড়াই,গ্যাস ওভেন ইত্যাদি।

০২. বাজার থেকে কিংবা ঘরোয়া উপায়ে প্রথমে পরিমান মতো ছানা নিয়ে আসুন। ছানার জোগাড় হয়ে গেলে ছানাটিকে সাদা কাপড়ে বেঁধে নিচড়ে,জল নিকাশ করে ঝড় ঝড়ে করে একটা বড়ো থালার মধ্যে রাখুন।

বড়ো থালার কথা এই জন্য বলছি,যাতে করে আপনি অতি সহজে ছানার দলা টিকে হাত দিয়ে মেখে মুলায়ম করে নিতে পারবেন।

যখন আপনার মনে হবে ছানার দলা গুলি ভেঙে মসৃন এবং একদম মুলায়ম হয়ে গেছে,তখন ছানা গুলোকে হাতে করে ছোট ছোট লেই করে রেখে দিন।

ছানার লেই করা শেষ হয়ে গেলে,এবারে ছানার লেই গুলোকে একটা,একটা করে নিয়ে হাতের তালুতে রেখে গোল,গোল করে গোলা পাকাতে থাকুন।

০৩.অপর দিকে গ্যাস ওভেন অন করে কড়াই বসিয়ে। কড়ায়ে পরিমান মত জল ও চিনি মিশিয়ে সিরাপ তৈরি করে নিন। সিরাপ যখন পুরোপুরি গরম হয়ে যাবে, তখন আপনার ছানার গোলা গুলোকে,

আস্তে,আস্তে ফুটন্ত রসের সিরাপের উপর ছাড়তে থাকুন। এভাবে যখন আপনি ছানার গোল্লা গুলোকে রসের সিরাপের মধ্যে ছাড়তে থাকবেন দেখবেন মিনিট ০৮ এর ব্যবধানে,

আপনার ছানার গোল্লার আকার ফুলে গিয়ে ডবল হয়ে যাবে। এই ভাবে ছানার গোল্লা গুলো রসের সিরাপের মধ্যে ছাড়া হয়ে গেলে কয়েক ঘন্টা গ্যাস ওভেন অফ করে,

কড়ায়ের রসের সিরার মধ্যে রসগোল্লা গুলোকে রেখে দিন। তার পর ০২-০৩ ঘন্টার ব্যবধানে আপনার রসগোল্লার মধ্যে রস প্রবেশ করে গেলে,আপনি সহজেই রসগোল্লা খাওয়ার জন্য পাতে পরিবেশন করতে পারেন।

রসগোল্লা গল্প (The story of Rasgolla)


নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি ও রসগোল্লার ইতিহাস নিয়ে,রসগোল্লার নানা গল্প শুনতে পাওয়া যায়। এরকম একটি রসগোল্লার গল্প হল,অষ্টদশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতবর্ষে,

তখন কলকাতার বুকে বিভিন্ন দেশি বণিকদের রমরমা নেহাত কম ছিলনা। একবার এরকম একজন বণিক ভগবান দাস বাগলার,তার পুত্রকে সঙ্গে করে ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চড়ে,

কলকাতার এক বণিক বাড়িতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পথের মধ্যে ভগবান দাসের ছেলের জল পিপাসা পেলে ভগবান দাস গাড়ির কচোয়ানকে গাড়ি থামানোর জন্য বলেন।

কচোয়ান তখন ঘোড়ার গাড়িটি বাঁক বাজারের কাছে নবীন ময়রার দোকানের সামনে এসে দাঁড় করান। ঘোড়া গাড়ি থেকে নেমে এসে ভগবান দাস তার ছেলের জন্য নবীন ময়রার দোকানে জল চায়।

নবীন ময়রা তখন রসগোল্লা সহযোগে ভগবান দাসের পুত্রকে জল খেতে দেয়। রসগোল্লা সহযোগে জলপান করে ভগবান দাসের পুত্র খুবই আনন্দ পায়।

এরপর ভগবান দাস বাগলার খুশি হয়ে এক হাঁড়ি রসগোল্লা সঙ্গে করে নিয়ে নেয়। সেই রসগোল্লা বণিক মহলে পরিবেশন করলে কলকাতার বুকে নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা সুনাম অর্জন করে।

কিন্তু আধুনিককালে রসগোল্লার খ্যাতি বাংলার বাইরে ছড়িয়ে নিয়ে যায় নবীনের উত্তরসূরি কে.সি.দাস। তিনি প্রথম রসোগোল্লাকে টিনের ক্যানে সিল করে রসগোল্লার খ্যাতি বাইরে ছড়িয়ে দেয়।

আজ বর্তমানে চেন্নাই,মুম্বাই,বাঙলোর সহ বিভিন্ন শহরে ছোট বড়ো মিলিয়ে ৬০০ কাছাকাছি নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লার ব্রাঞ্চেস তৈরি করা হয়েছে। আজকে নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লার খ্যাতি দেশ ছড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছে গেছে।

রাশিয়া,আফ্রিকা,আমেরিকা সহ বিভিন্ন পাশ্চত্য দেশের মুদি দোকানে,নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লার টিনের ক্যানের পাকিং করা রসগোল্লা পাওয়া যায়।

রসগোল্লার অস্তিত্ব নিয়ে বাংলাদেশ,ওডিশা সহ বিভিন্ন অঞ্চলে আপোসে ঠান্ডা লড়াই রয়েই গেছে। বাংলাদেশের কাছে রসগোল্লার আবিষ্কারের কোনো লিখিত প্রমান না থাকলেও,

বাঙালির শেষ পাতে রসরাজ রসগোল্লা। 2

বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের মতে রসগোল্লা অবিভক্ত বাংলাদেশের ফিরোজপুর অঞ্চলের ময়রাদের দ্বারা প্রথম তৈরি করা হয়।

বাংলাদেশের পটুয়াখালীর দিকে পর্তুগিজ বণিকদের আগমন শুরু হলে বাংলাদেশী ময়রারা পর্তুগিজদের কাছ থেকে ছানা সহ বিভিন্ন মিষ্টি তৈরির কৌশল শিখে প্রথম রসগোল্লা তৈরি করেছিল।

তাদের অনুমান,পরবর্তীকালে নবীন ময়রার পূর্বসূরির হাত ধরে রসগোল্লা বাংলা ও ওড়িষ্যা সহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পরে। আবার অনেকের মতে রসগোল্লা প্রথম তৈরি করেছিল নদিয়া জেলার ফুলিয়া গ্রামের হারাধন ময়রা।

১৮৪৭ সালের দিকে হারাধন ময়রা রানাঘাটের পাল চৌধুরী জমিদারদের ঘরোয়া ময়রা ছিলেন। একবার হারাধন ময়রার ছোট বালিকা দোকানে এসে মিষ্টি খাব বলে কান্না জুড়ে দিলে।

মেয়ের কান্না ভোলানোর জন্য একটা ছানার গোল্লা করে গরম সিরার মধ্যে ফেলে দিলে দেখেতে পাওয়া যায়, সেই ছানার গোল্লা ফুলে ফেঁপে এক উৎকৃষ্ট রকমের খাওয়ার যোগ্য মিষ্টি প্রস্তুত হয়ে গেছে।

তবে ওড়িষ্যা রসোগোল্লাকে তাদের ৮০০ বছরের প্রাচীন সম্পদ বলে দাবি করে আসছে। তাদের মতে রসগোল্লা হল জগন্নাথ প্রভুর ভোগ, রসগোল্লার (Rasogolla) ওড়িষ্যার পরিচয় হল ক্ষীরমোহন নামে।

এই রসোগোল্লাকে নিয়ে, প্রভু জগন্নাথ দেবকে কেন্দ্র করে খুব সুন্দর একটা রসগোল্লা গল্প আছে,জগন্নাথ দেব একবার তার স্ত্রীর অনুমতি না নিয়েই,

০৯ দিনের জন্য রথ যাত্রায় চলে যায়। স্বামীর প্রতি অভিমান করে লক্ষি দেবী তখন মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশের মুখ্য দ্বার “জয় বিজয়” বন্ধ করে রেখে দেয়।

ভগবান জগন্নাথ তখন লক্ষীদেবীর রাগ ভঞ্জন করার জন্য রসগোল্লা নিয়ে গিয়ে লক্ষীদেবীর কাছে উৎসর্গ করেন। এইভাবে লক্ষীদেবীর রাগ ভঞ্জন করে জগন্নাথ দেব মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশের অনুমতি পেতেন।

আবার ওড়িষ্যার লোকমতে এও শুনতে পাওয়া যায়,রাজধানী ভুবনেশ্বরের অদূরে পাহলা বলে একটি গ্রাম ছিল। সেই গ্রামে অনেক গাভী থাকায় দুধ উৎপাদন হত পর্যাপ্ত পরিমানে।

অতিরিক্ত দুধ উৎপাদন হলে তা ফেলে দেওয়া হত। জগন্নাথ মন্দিরের এক পূজারী এই রকম দুধের লোকসান হতে দেখে তিনি দুধ থেকে রসগোল্লা তৈরির কৌশল শিখিয়েছিলেন।

আর একটি মিষ্টি রসগোল্লার গল্প বলে রসগোল্লার গল্প শেষ করব। একবার বিখ্যাত সংগীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মন তার সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের সহযোগীদের নিয়ে একটি বৈঠক খানায় সকলকে নিমন্ত্রণ দিয়েছিলেন।

সেই নিমন্ত্রনে লতা মঙ্গেশকর সহ আরো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। রাহুল দেব তখন কলকাতা থেকে আনা একটি টিনের রসগোল্লার ক্যান সবার সম্মুখে তুলে ধরলেন।

সবাই যে যার মতো করে হাতে করে একটি করে রসগোল্লা নিয়ে নেয়। কিন্তু হঠাৎ করে একটি কাজ পড়লে রসগোল্লার ক্যান টিকে টেবিলে রেখে রাহুল দেব বর্মণ বাইরে আসে।

কাজ শেষ হয়ে গেলে রাহুল দেব বর্মন ফিরে এসে দেখে,রসগোল্লার ক্যানে একটি মাত্র রসগোল্লার অবশিষ্ট নেই। তা দেখে তো রাহুল দেব বর্মনতো চটে অস্থির হয়ে গেছেন।

তার শখের কলকাতা থেকে আনানো,রসগোল্লার (Rasogolla) একটিও অবশিষ্ট রাখেনি বলে। যাই হোক সেদিন এভাবেই মামলা রফা দফা হয়ে যায়।

পরের দিন ষ্টুডিওতে সবাই রেকর্ডিং এর জন্য উপস্থিথ হয়েছেন,গানের মহড়া চলছে হরিজী মিষ্টি মধুর শুরে বাঁশি বাজাচ্ছেন। মাঝখানে রাহুল দেব বর্মন রেকর্ডিং থামিয়ে বললেন, এই হরিজী

ক্যানের সমস্ত রসগোল্লা খেয়েছে,সেই জন্য আজকে হরিজীর বাঁশির সুর অন্যদিনের তুলনায় বেশি মিষ্টি শোনাচ্ছে।

রসগোল্লার জি.আই.ট্যাগ (GI Tag in Rasogolla)


রসগোল্লার জি.আই.ট্যাগ (Geographical Indication Tag) নিয়ে ২০১৫ সালের ২৭ শে এপ্রিল ওড়িষ্যা বিধানসভায় প্ৰশ্ন ছুড়ে দেয় বিজেপির বিধায়ক আর.পি.সোয়াইন।

এরপর থেকে ওড়িষ্যা এবং পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে রসগোল্লার জি.আই.ট্যাগ নিয়ে আইনি লড়াই শুরু হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গ রসগোল্লার প্রমানে ১৮ এর দশকের,

নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি ও রসগোল্লার ইতিহাস তুলে ধরে এবং শেষ মেশ এই আইনি লড়ায়ে ২০১৭ সালে ১৪ ই নভেম্বর জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিয়া স্পষ্ট করে দেয় বেঙ্গল রসগোল্লার,আসল দাবিদার হল পশ্চিমবঙ্গ।

তবে চেন্নাইয়ের জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিয়া এও স্পষ্ট করে দেয় যে ওড়িষ্যা তাদের রসগোল্লার পরিপেক্ষিতে কোনো উপযুক্ত প্রমান তুলে ধরেন নি।

পরে যদি ওড়িষ্যা তাদের জি.আই ট্যাগের জন্য উপযুক্ত প্রমান দিয়ে থাকে তাহলে,রসগোল্লার জি.আই.ট্যাগ ওড়িষ্যা পেতে পারে।

পরে আপামর রসগোল্লা প্রেমী ১৪ ই নভেম্বর কে “রসগোল্লা দিবস” রূপে পালন করার আর্জি জানায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে,মাননীয়া মুখুমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জনতার এই দাবি খুশি খুশি মেনেও নেয়।

অপরদিকে রসগোল্লাকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের এই বাড়-বাড়ন্ত ওড়িষ্যার সহ্য হয়না। রসগোল্লা ও জগন্নাথ দেবকে সমর্পিত ক্ষীরমোহন এর ইতিহাস ৮০০ বছরের পুরোনো। যা তাদের ভাবাবেগে আঘাত হানে।

এরপর ওড়িষ্যা সরকার ওড়িষ্যার ক্ষীরমোহন এর জন্য প্রভু জগন্নাথের জন্য সমর্পিত করা ৮০০ বছরের    রসোগুল্লার পরম্পরা তুলে ধরে। এছাড়া ওডিশার বিখ্যাত কবি বলরাম দাসের কবিতায়,

রসোগুল্লার উল্লেখ পাওয়া যায়। এর উপর ভিত্ত্বি করেই জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিয়া ২০১৯ সালের ২৯ শে জুলাই ওড়িষ্যার ক্ষীরমোহন রসগোল্লার জি.আই.ট্যাগ ওড়িশ্যা রসোগুল্লার নাম করে দেয়।

বেঙ্গল রসগোল্লা এবং ওড়িষ্যা ক্ষীরমোহন রসগোল্লার মধ্যে পার্থক্য


নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি ও রসগোল্লার ইতিহাস এবং ওড়িষ্যা জগন্নাথ দেবের ভোগে উৎসর্গ করা ক্ষীরমোহন রসগুল্লার, রসগোল্লা রেসিপির মধ্যে পার্থক্য আছে বিস্তর।

বাঙালির শেষ পাতে রসরাজ রসগোল্লা। 1 1

নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি হল পিওর ছানার রসগোল্লা রেসিপি। রসগোল্লা গল্পে,নবীন ময়রা হল আদি স্পঞ্জ রসগোল্লার উদ্যোক্তা।

অপরদিকে জগন্নাথ প্রভুর ভোগে অর্পিত ক্ষীরমোহন রসোগুল্লার স্বাদ ও রসগোল্লা রেসিপি সম্পূর্ণ আলাদা। আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি,ছানা হল দুধের বিকৃত রূপ।

এক কথায় দুধে অম্ল জাতীয় জিনিস প্রয়োগ করে,দুধ ফাটিয়ে ছানা তৈরি করা হয়। তাই বিকৃত পদার্থ ভগবানের পূজার নৈবদ্যে উৎসর্গ করতে নেই।

তাই ভগবান জগন্নাথের প্রসাদে ওড়িশ্যায় যে ক্ষীরমোহন রসোগুল্লা অর্পণ করা হয়, সেই ক্ষীরমোহন রসগোল্লার রেসিপি ও নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি ও রসগোল্লার ইতিহাস এক্বেবারেই আলাদা।

ক্ষীরমোহন রসগোল্লা তৈরি হয় ক্ষীর পুড়িয়ে দই ও সুজির মিশ্রন করে কড়া ভারী গুড়ের মিষ্টির সিরার পাকে। সুতরাং জগন্নাথ দেবের ভোগে দুধের বিকৃত রূপ ছানার রসগোল্লা অর্পণ করা হয় না।

জগন্নাথের সেবায় ক্ষীর দিয়ে তৈরি ক্ষীরমোহন রসগোল্লা প্রধান উপাদেয় হিসাবে,ভগবানের নৈবদ্যে অর্পণ করা হয়। অপরদিকে নবীন চন্দ্র দাসের

স্পন্জ রসগোল্লা (Raogolla )তৈরি হয় পিওর ছানা দিয়ে,যার মধ্যে সুজি কিংবা ক্ষীর জাতীয় কিছু মিশ্রণ করা হয়না।

রসগোল্লা নিয়ে সৈয়দ মজতুবা আলীর রচনাবলী


রস প্রিয় বাঙালির রসগোল্লা প্রীতির ছোঁয়া সাহিত্যিকদের সাহিত্য কর্মেও পরিস্ফুটিত হয়। সৈয়দ মজতুবা আলীর রচনায় রসগোল্লার গল্প অল্প হলেও চোখে পড়ে।

রসোগোল্লাকে নিয়ে ঝান্ডুদার চরিত্রে সৈয়দ মজতুবা আলী,রসগোল্লার রস,রসাত্মক ঝান্ডুদার চরিত্রে খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

রসগোল্লা প্রেমিক ঝান্ডুদাকে আমরা দেখতে পায়- তিনি রসগোল্লার ক্যান সঙ্গে করে ইতালি নিয়ে গেছিলেন। কিন্তু সেখানকার এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি ঝান্ডুদার,

রসগোল্লার ক্যান খুলে দেখতে চাইলে,তা নিয়ে তুমুল উত্তেজনা ও রোমাঞ্চের সৃষ্টি করে সৈয়দ মজতুবা আলী। ঝান্ডুদা তো এয়ারপোর্টের সিকিউরিটি দ্বারা রসগোল্লার ক্যান খোলা নিয়ে পাগলময় অবস্থা।

নিয়ম কানুনের তকমা না করেই রসগোল্লা নষ্ট হয়ে যাবে বলে,রাগে রসগোল্লার ক্যান সহ রসগোল্লা সিকিউরিটির মুখে থেবড়ে দেয়। সেই রসগোল্লার টেস্ট পেয়ে সিকিউরিটির নিচে লুটিয়ে পড়া মিষ্টি কুড়িয়ে পরে তুলে খায়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই রসগোল্লার রোমাঞ্চ নিয়ে খুব সুন্দর হাসির ফোয়ারায় ভরা হাস্য রসাত্মক,রসগোল্লা গল্প রচনা করেছিলেন সৈয়দ মজতুবা আলী-

“রসের গোলক তুমি,এতো রস তুমি কেন ধরেছিলে হায় !                                                                  ইতালির দেশে,ধর্ম ভুলে লুটাইল তব পায়।”

পরিশিষ্ট


পরিশেষে একজন রসগোল্লা প্রেমিক বাঙালি হিসাবে বলব, রসগোল্লা গল্প ও কথায় রসগোল্লা (Rasogolla),তুমি যেখানকার হও কিনা,তুমি বাঙালির পাতে রস দিয়ে রসরাজ হয়েই আছ আজও।

যাই হোক নবীন চন্দ্র দাসের রসগোল্লা রেসিপি ও রসগোল্লার ইতিহাস,রসগোল্লা গল্প পড়ে আপনাদের কেমন লাগল, আপনাদের মূল্যবান মতামত প্লিজ কমেন্ট করে জানাবেন।

রসগোল্লা গল্প লেখার মধ্যে কোনো ত্রুটি থাকলে,ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে,ভুল গুলো ধরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ রইল। আর সত্যিই যদি আমার লেখা আপনাদের ভালো লেগে থাকে সবার কাছে অনুরোধ,

আপনাদের প্রিয়জনের সাথে এই রসগোল্লা গল্প,বিভিন্ন সোশ্যাল মাধ্যমে শেয়ার করে দেবেন। আপনাদের একটা শেয়ার ও আপনাদের মূল্যবান মতামত আমার আগামী লেখার পাথেয় হবে। ধন্যবাদ।