দীপাবলি মানে কি এবং দীপাবলি কেন পালন করা হয় (Depabali Kali Puja 2021)

দূর্গাপূজা কোজাগরী লক্ষী পূজার পরে পরেই চলে আসে হিন্দুদের আলোর উৎসব দীপাবলি। দীপাবলির পরেই আসে ভাইফোঁটাছট পূজা

দীপাবলি শুধু নির্দিষ্টভাবে হিন্দু ধর্মের উৎসব নয়,দীপাবলি হল সব ধর্মের সম্প্রীতির উৎসব। হিন্দুদের সাথে শিখ,জৈন,বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষরাও দীপাবলি উদযাপন করে থাকেন।

কিন্তু দীপাবলি কেন পালন করা হয় এবং দীপাবলি মানে কি,দীপাবলির ইতিহাসের অতীত কাহিনী জানার আগ্রহ আমাদের সবারই আছে।

বর্তমানে ভারত সহ শ্রীলঙ্কা,বাংলাদেশ,নেপাল,ভুটান,মায়ানমার,মালেশিয়া,সিঙ্গাপুর,টোবাগো ইত্যাদি দেশ গুলোতে দীপাবলির দিনে সরকারি ভাবে সমস্ত দফতরে ছুটি থাকে।

দীপাবলি মানে কি

দীপাবলি শব্দের আক্ষরিক মানে হল প্রদীপের সমষ্টি,তাই এককথায় প্রদীপের সমন্বয়কে দীপাবলি বলা হয়। দীপাবলির বিশেষ দিনে হিন্দুরা তাদের ঘরে ছোট ছোট মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোর রোশনায়ে দীপাবলি উদযাপন করেন।

একদিকে কোজাগরী লক্ষী পূজায় বাঙালিরা যেমন,কোজাগরী পূর্ণিমার দিন রাত্রে,মা লক্ষীর কৃপা লাভের আশায় ঘরে ঘরে ঘী সলতের প্রদীপ জ্বালিয়ে মা লক্ষীর কাছে ধন প্রাপ্তির আশা করেন।

ঠিক একইভাবে উত্তর ভারত সহ আরো অন্যান্য রাজ্যে অবাঙালিরা দীপাবলির দিন মা লক্ষীর আরাধনা করে ঘরে ধন প্রাপ্তির আশায় সারা রাত প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন এবং ঐ দিন পরিবারের সকলে নতুন জামা কাপড় পড়েন।

আত্মীয় স্বজন,বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ এবং কচিকাচারা দীপাবলির দিন রাত্রি বেলা বিভিন্ন ধরণের রং মশাল এবং আতশবাজি ফাটিয়ে দীপাবলি উদযাপন করেন।

দীপাবলি কেন পালন করা হয়

দীপাবলি হল পাঁচ দিন ব্যাপী পালিত হওয়া হিন্দুদের একটি পবিত্র উৎসব। আশ্বিন মাসের ত্রয়োদশীর দিন থেকে লক্ষী ,গণেশ,সরস্বতী সহ ধনের রাজা কুবেরের পূজার মাধ্যমে দীপাবলির প্রথম দিন ধনতেরাস উৎসবের সূচনা হয়।

তারপর দুদিন বাদে শুক্ল তিথিতে ভাইফোঁটা পেরোলে দীপাবলির সমাপ্তি হয় । দীপাবলি নিয়ে পুরানে ও বিভিন্ন গ্রন্থে বিভিন্ন কাহিনীর বর্ণনা পাওয়া যায়, তার মধ্যে হিন্দুদের কাছে রামায়ণের কাহিনীতে

রাম চন্দ্রের ১৪ বছর বনবাস কাটিয়ে,রাবনকে বধ করার পর সীতাকে নিয়ে অযোধ্যায় ফিরে এসে অযোধ্যা নগরীতে প্রদীপ জ্বেলে দীপাবলি উদযাপন করার কাহিনী সব থেকে বেশি জনপ্রিয় ।

বাল্মীকি রামায়ণের কাহিনী অনুসারে সরযূ নদীর তীরে অবস্থিত অযোধ্যা নগরী ছিল ধনধান্যে সমৃদ্ধ একটি জনপদ। অযোধ্যার রাজা ছিলেন রাজা দশরথ।

দশরথ প্রজাদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় পাত্র ছিলেন, রাজা সর্বদা প্রজা কল্যানে ব্রতী থাকতেন। অযোধ্যা নগরে দশরথ রাজার রাজত্বে কোনো পথিক,ভিখারী,পথের পশু অভুক্ত থাকতনা।

ঋষি,মুনি,ব্রাহ্মণ পন্ডিত গণ রাজার যথেষ্ট স্নেহধন্য ছিলেন। রাজা দশরথ ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক এবং পরোপকারী একজন রাজা। দশরথ রাজার রাজ্যের সকল প্রজা অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন।

রাজ্যের প্রজারা সকলেই ঠাকুর পূজা অর্চনা করতেন,অগণিত মিথ্যাচার ও কটুকাজ কেউ করতেন না। সকলেই ছিলেন সত্যবাদী শাস্ত্রজ্ঞ,ধর্মপরায়ণ, প্রজাদের কেউ পরের সম্পত্তিতে আসক্ত ছিল না।

দীপাবলি কেন পালন করা হয়
দীপাবলি কেন পালন করা হয়

এত সুন্দর সোনার অযোধ্যা নগরী ১৪ টা বছর রঘু বংশের বংশ প্রদীপ শ্রী রাম চন্দ্রকে ছাড়া নিষ্প্রদীপ হয়ে গেছিল। টানা ১৪ বছর বনবাস জীবন কাটিয়ে লঙ্কার রাজা রাবনকে বধ করে সীতাকে সঙ্গে করে অযোধ্যা ফিরে আসে।

অযোধ্যায় ফিরে আসার খবর পেলে অযোধ্যাবাসী পুরো অযোধ্যা নগরীকে শ্রী রাম চন্দ্র,সীতা দেবী ও ভাই লক্ষণের স্বাগতম করার জন্যে সুন্দর প্রদীপের দীপ মালায় সাজিয়ে তোলেন।

তারপর থেকে হিন্দু ধর্মের শ্রদ্ধালু মানুষেরা প্রতি বছর অন্ধকারের কালিমা ঘুচিয়ে শ্রী রাম চন্দ্রের স্বগোতমার্থে ঐ দিনটাকে দীপাবলির দিন হিসাবে প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোর উৎসব হিসাবে উদযাপন করেন।

দীপাবলির ইতিহাস

দীপাবলি হল হিন্দু ধর্মের ০৫ দিন ধরে পালিত হওয়া একটি উৎসব। তবে বৈচিত্র্যময় ভারতবর্ষে দীপাবলি বছরে দুবার পালিত হয়। যেমন- উত্তর ভারতে দীপাবলি শরৎ কালে অনুষ্ঠিত হয়

এবং একইভাবে দক্ষিণ ভারতে দীপাবলি বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হয়। যাইহোক শরৎকালে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণ ত্রয়োদশীর দিন হল ধনতেরাসের দিন। এই দিন পশ্চিমভারতে গণেশ,লক্ষী,সরস্বতী ও কুবেরের পূজা করা হয়।

অনেককে আবার ঐ দিন সোনা,রুপার কয়েন,গয়না ও বাসনপত্র কিনতে দেখা যায়। ধর্মীয় বিশ্বাসমতে ধনতেরাসের দিন সোনা দানা ক্রয় করলে মা লক্ষী এবং ধনরাজ কুবের সহায় হয়।

দীপাবলি উৎসবের দ্বিতীয় দিনকে ভুত চতুর্দশী বলা হয়। ভূত চতুর্দশীর দিন গ্রাম বাংলার মানুষেরা ১৪ রকমের শাক একসাথে রান্না করে একটি পদ রান্না করে খায়, এই পদকে চোদ্দ শাক বলা হয়।

পুরাণের কাহিনী অনুসারে শাক দ্বীপি ব্রাহ্মণগণ ভূত চতুর্দশীর দিন চোদ্দ শাক খাওয়ার প্রথা চালু করেন। তাছাড়া আয়ুর্বেদ অনুসারে শরৎকালে এই সময় মৌসমের তারতম্যজনিত কারণে

শরীরে নানারকম রোগ ব্যাধি সংক্রমণের প্রকোপ অনেকটাই বেড়ে যায়। তাই সেই সময় প্রাচীন ঋষি মুনিগন উপলব্ধি করেন, চোদ্দ শাকের ভেষজগুন মানব শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।

চোদ্দ শাখার এই বিশেষ শাক গুলো হল- কলমি শাক,পালং শাক,সর্ষে শাক,লাল শাক,শুশনি শাক,নোটে শাক,পুঁই শাক,মেথি শাক,লাউ শাক,ধোনে শাক,সজনে শাক,কুমড়ো শাক,মুলো শাক এবং হিঞ্চে শাক।

এছাড়া ভূত চতুর্দশীর দিন রাত্রি বেলা অনেক বাঙালিরা তাদের ঘরের ১৪ কোনায় ১৪ টি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে। হিন্দু ধর্মের বিশ্বাসনুযায়ী ভূত চতুর্দশীর দিন মা কালীর আগমনের সাথে

তাদের পূর্বপুরুষদের আত্মার আগমন ঘটে,তাই পিতৃপুরুষদের প্রদীপ দেখালে তাদের অতৃপ্ত আত্মার মোক্ষ লাভ হয় এবং পূর্বপুরুষেরা খুশি হয়ে তাদের বংশজদের আশীর্বাদ করে।

দীপাবলিতে বাঙালি সংস্কৃতিতে কালী পূজার প্রচলনের ইতিহাস

কৃষ্ণ ত্রয়োদশীর দিন থেকে একে একে প্রথম ও দ্বিতীয় দিন পেড়িয়ে তৃতীয় দিনে দীপাবলি অনুষ্ঠিত হয়। দীপাবলির দিন পশ্চিমবঙ্গ,উড়িষ্যা, ত্রিপুরা,আসাম এবং আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে কালী পূজা (শ্যামা পূজা) করা হয়।

কিন্তু ভারতের অন্যান্য রাজ্যে দীপাবলিতে লক্ষী,গণেশ,সরস্বতী ও ধন রাজ কুবেরের পূজা করা হয়। যদিও মা কালীকে মূলত তন্ত্র মন্ত্রের দেবী বলেই মানা হয়।

কিন্তু তান্ত্রিকদের আরাধ্য দেবী মা কালীর পূজা কিভাবে সার্বজনীন বারোয়ারী প্রথার রূপ পেল তার ইতিহাস ঘাঁটলে কাশী নাথের “কালী সপর্যাসবিধি” গ্রন্থে কালী পূজার বিধান পাওয়া গেলেও

বাংলায় কালী পূজার প্রচলন নিয়ে সেরকম ঠোস কোনো প্রমান পাওয়া যায়না। আগেকার দিনে ঘরে ঘরে বারোয়ারী কালীপূজার প্রচলন ছিলনা।

কালী পূজা হত গভীর জঙ্গলে,শশ্মানে ডাকাত ও তান্ত্রিকরাই কালী পূজা করতেন। কিন্তু সর্বপ্রথম মা কালীর মৃন্ময়ী রূপের কল্যাণময়ী মাতৃরূপ দান করেন কৃষ্ণানন্দ আগামবাগীশ।

তবে অষ্টদশ শতাব্দীতে কালী পূজাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাঙালির ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়। শাক্ত ধর্মের উপাস্য দেবী হয়ে ওঠে হিন্দু সনাতন ধর্মে মৃন্ময়ী মাতৃ রূপ পায়।

এরপর দীপাবলির চতুর্থ দিন হল শুক্ল প্রতিপদের দিন এই দিন হিন্দু ধর্মের মানুষের অনেককেই গোবর্ধন পূজা করতে দেখা যায়। দীপাবলির শেষ দিন হল পঞ্চম দিন,এই দিন হিন্দু ধর্মের মানুষেরা ভাইফোঁটা পালন করেন।

ভাই ফোঁটার দিন দিদিরা তাদের ভাইদের কপালে ফোঁটা দিয়ে ভাইয়ের দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করেন। কথিত আছে সেদিন যমরাজ যমা লয় ছেড়ে তার বোন যমুনার কাছে ফোঁটা পড়ার জন্য আসেন।

মহাভারতের কাহিনীতে দীপাবলির ইতিহাস

মহাভারতের কাহিনীতে দীপাবলি নিয়ে দুটি কাহিনীর চর্চা শোনা যায়। ১মত : নরকাসুরের দৈরাত্বে যখন স্বর্গবাসী দেবতাগণ এবং মর্ত্যের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে,

তখন ভগবান শ্রী কৃষ্ণ নরকাসুরকে বধ করে,নরকাসুরের কারাগারে বন্দি ১৬০০ রমণীকে উদ্ধার করেন। নরকাসুরের প্রসাদে উদ্ধার করা ১৬০০ রমণীরা একসাথে কৃষ্ণকে পাওয়ার অভিলাষ ব্যক্ত করেন।

পরে ভগবান শ্রী কৃষ্ণ এই ১৬০০ গোপীগণকে নিয়ে বৃন্দাবনে রাসলীলা রচেছিলেন। যাইহোক নরকাসুরের মৃত্যুর সময় নরকাসুর ভগবান কৃষ্ণের কাছে বড় চান তার এই মৃত্যুর দিনটি যেন খুব ধুম ধামের সাথে

আলোর রোশনায়ে উদযাপন করা হয়। পরে অবশ্য নরকাসুর বধ করে কৃষ্ণের মথুরা ফিরে আসার খবর পেয়ে পুরো মথুরাবাসী ঐ দিন পুরো ধুম ধামের সঙ্গে নিজে নিজেদের দ্বারে প্রদীপ জ্বালিয়ে দীপাবলি উদযাপন করেছিলেন।

২য়ত : পঞ্চপাণ্ডবদের ১২ বছর অজ্ঞাত বনবাস কাটিয়ে দীপাবলির দিনে হস্তিনাপুর ফিরে আসেন। হস্তিনাপুরবাসী পান্ডবদের স্বাগতম করার জন্য প্রদীপ জ্বালিয়ে দীপাবলি পালন করেছিলেন।

পুরাণের কাহিনীতে দীপাবলির ইতিহাস

পুরাণের কাহিনী অনুসারে দীপাবলির দিনে দেবতা এবং অসুর মিলে সমুদ্র মন্থন করেন। সমুদ্র মন্থনের ফলে দেবী লক্ষী এবং ধন কুবের সহ আরো ধন রত্ন সহ অমৃত ও অন্যান্য সামগ্রী উঠে আসে।

পুরাণের কাহিনীতে সমুদ্র মন্থনের ফলে দীপাবলির দিনে মা লক্ষীর আগমন হয়েছিল তাই,দীপাবলির দিনকে মা লক্ষীর জন্মদিন বলা হয়।

এইজন্য ধন লাভের আসায় দীপাবলির দিনটিকে মা লক্ষীর জন্মদিন হিসাবে লক্ষী,সরস্বতী,গণেশ সহ ধন রাজ কুবেরের পূজা করে ধনতেরাস উদযাপন করা হয়।

শিখ ও জৈন ধর্মে দীপাবলির ইতিহাস

শিখ সম্প্রদয়ার ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ সিং দীপাবলির দিনে জাহাঙ্গীরের কাছে যুদ্ধে জয় করে তার সাথে ৫২ জন বন্দী হিন্দু রাজাকে জাহাঙ্গীরের কারাগার থেকে উদ্ধার করেন। শিখ ধর্মে দীপাবলির এই বিশেষ দিনকে

“বন্দী ছোড়ে দিবস” নামে পালন করা হয়। ১৫৮৮ সালে অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরের নিব দীপাবলির দিন স্থাপন করা হয়,তাই শিখ সম্প্রদয়ার মানুষেরা দীপাবলির দিন গুরুদুয়ারে প্রদীপ জ্বালিয়ে দীপাবলি উদযাপন করেন।

জৈন ধর্ম মতে ৫২৭ খ্রিস্টাব্দ পূর্বাব্দে মহাবীর দীপাবলির দিনে নির্বাণ লাভ করেছিলেন ,তাই জৈন ধর্মের মানুষেরা দীপাবলির দিনটাকে মহানির্বান দিবস হিসাবে পালন করেন।

দীপাবলির গান

আপনাদের জন্যে সর্বকালের খুব সুন্দর দীপাবলির গান শেয়ার করা হল,আশাকরি আপনারা দীপাবলির গান শুনে উপভোগ করবেন

দীপাবলির গান

পরিশিষ্ট

আমরা বাঙালিরা উৎসব ও আনন্দপ্রান মানুষ,আমরা বারো মাসে তেরো পার্বণের বাঙালি। তাই দীপাবলি কেন পালন করা হয়,দীপাবলি মানে কি না জানা থাকলেও আমাদের বাঙালিদের দীপাবলির আনন্দের আলোর রোশনায়ে খামতি থাকেনা।

দীপাবলি হল আলোর উৎসব,এই আলোর উৎসবে আসুন আমরা আমাদের অন্ধকার মনের কালিমা দূর করে দীপাবলির আলোর রোশনায়ে মনের কালিমা মুছে ফেলি।

FAQ

প্রশ্ন : দীপাবলি অর্থ কি ?

উঃ দীপাবলির অর্থ হল প্রদীপের সমন্বয়।

প্রশ্ন : দীপাবলি কবে ?

উঃ দীপাবলি ইংরেজি ০৪ নভেম্বর,বৃহস্পতি বার।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here