কোহিনুর হীরার ইতিহাস (Kohinoor Diamond History)

আজকে আমরা আলোচনা করব বিশ্বের এক অমূল্য সম্পদ কোহিনুর হীরার ইতিহাস (Kohinoor Diamond History) সমন্ধে।

কথায় আছে অতিরিক্ত ধনসম্পদ সর্বদা মানুষের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আজকে আপনাদের কাছে এরকম একটি মুল্যবান রত্ন কোহিনুর হীরার ইতিহাস (Kohinoor Diamond History) শোনাব।

কোহিনুর হীরার নাম শুনলে আমাদের মনে প্রথমেই যে ধারণা আসে সেটা হল একটি অমূল্য রত্ন যেটা হল অমূল্য একটা জিনিস যা টাকা দিয়েও পাওয়া যায়না।

সাধারণত মানুষ রত্ন ধারণ করে ভাগ্য পরিবর্তন করার জন্য,জৌতিষীরা বলে রত্ন ধারণে ভাগ্যের সমস্ত রকম দোষ কেটে যায়। কিন্তু এমনটা কখনো কারো কাছে শুনেছেন

যে রত্ন ধারণে মানুষের ভাগ্যদোষ কেটে না গিয়ে উল্টভাবে ভাগ্যদোষ ঘটে। কি হল আমার কথাটা শুনে অবাক হচ্ছেন নিশ্চয় ? কিন্তু অবাক হওয়ার মত কিছু নয়

একটু পরেই জানতে পারবেন আমি রত্ন ধারণে ভাগ্যদোষের কথা কেন বলছি। তবে একথাটা তো সত্য শুধু ধন সম্পদে মানুষের ঐশ্বর্য বাড়ে ঠিক কিন্তু প্রকৃত সুখ কোনো গ্রহ রত্ন দিতে পারেনা।

কোহিনুর হীরার ইতিহাস (Kohinoor Diamond History)


কোহিনুর হীরার ইতিহাস (Kohinoor Diamond History) নিয়ে লোক মুখে অনেক কাহিনী শোনা যায়। পৌরাণিক মতে কোহিনুর হীরার ইতিহাসে পৌরাণিক যোগ পাওয়া যায়।

আজ থেকে প্রায় ৫,০০০ বছর আগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সময় থেকে কোহিনুর হীরার অস্তিত্ব ছিল,তখন কোহিনুর হীরার নাম ছিল শ্রীমন্ত হীরা যদিও এই তত্বের ঐতিহাসিক কোনো প্রমান মেলেনি।

আনুমানিক ১৩,০০০ হাজার খ্রিস্টাব্দ পূর্বাব্দে অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টার কাছে গোলকুণ্ডা হীরের খনি থেকে কোহিনুর হীরাটি পাওয়া যায়। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখলে

দেখতে পাওয়া যায়,গোলকুন্ডা হীরের খনি থেকে যে সমস্ত হীরা গুলি পাওয়া গেছে সেই সমস্ত হীরা গুলির বেশির ভাগই বিদেশে কোনো কোনো সংগ্রহশালায়,সংগ্রহশালার শোভা বাড়াচ্ছে।

প্রাচীন কালের অন্যান্য হীরার খনির মধ্যে গোলকুন্ডা ছিল অন্যতম বড় একটা হীরের খনি,যদিও পরে ব্রাজিলে এর থেকে বড় হীরার খনির সন্ধান পাওয়া যায়।

কোহিনুর হীরার ইতিহাস
কোহিনুর হীরার ইতিহাস

গোলকুণ্ডার খাদান থেকে পাওয়া কোহিনুর হীরার ওজন ছিল ৭৯৩ ক্যারেট,এটাই ছিল পৃথিবীর সবথেকে বড় আকারের হীরা। এর আগে এত বড় হীরা কোথাও পাওয়া যায় নি।

তবে প্রথম থেকেই কোহিনুর হীরার নাম কোহিনুর ছিল না,কোহিনুর হীরাকে আর পাঁচটি অন্য হীরা থেকে একটু বড় আকারের হীরা বলেই সবাই জানত।

পরে কোহিনুর হীরা এক হাত থেকে অন্য হাতে হাতবদল হয়েছে এবং তারা নিজেরা নিজের মত করে কোহিনুরকে বিভিন্ন নামে ব্যবহার করেছে।

আরো পড়ুন : কৌটিল্য পন্ডিতের জীবনী। 

কোহিনুর শব্দের অর্থ কি ও কোহিনুর হীরার নামকরণ


১৭৩৯ সালে ইরানের বাদশা নাদির শাহ ভারত আক্রমন করলে কর্নালের যুদ্ধে মুঘলদের পরাজয় ঘটে এবং মুঘল বাদশাদের যাবতীয় রত্ন ভান্ডার লুট করে নিয়ে যায়।

নাদির শাহের লুট করা রত্ন সামগ্রীর মধ্যে একটি বড় মাপের দুর্লভ হীরা বাদশা নাদির শাহের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যার জন্য নাদির শাহ হীরাটির উপর মোহিত হয়ে যায়।

নাদির শাহের রত্ন ভাণ্ডারে এর আগে এত বড় চমকদার কোনো রত্ন ছিল না যা নাদির শাহের রত্ন ভান্ডারকে আলোকিত করে তুলছিল।

নাদির শাহ হীরাটিকে দেখে এতটাই সম্মোহিত ছিলেন যে সর্বদা হীরাটিকে হাতের তলায় নিয়ে এসে দেখতে থাকতেন এবং একদিন হীরা টিকে দেখতে দেখতে নাদির শাহের মুখ দিয়ে

হীরাটি সম্পর্কে একটি কথা বার হয়ে আসে,কথাটি হল- কোহি-ই-নুর। ইরানিতে পার্সি ভাষার শব্দ কোহি যার অর্থ হল পাহাড় এবং নুর শব্দের অর্থ হল আলো। কোহি এবং নুর দুটি শব্দ মিলিয়ে

অর্থ দাঁড়ায় পাহাড় ভেদ করে বেরিয়ে আসা আলো। এর আগে কোহিনুর হীরার আলাদা করে নির্দিষ্ট কোনো নাম ছিল না। নাদির শাহের দেওয়া নামের পর থেকে হীরাটি কোহিনুর নামে বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে।

কোহিনুর হীরার দাম কত


কোহিনুর হীরার দাম নির্ধারণ করা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়ে ওঠেনি কারণ এখনো কোহিনুর হীরা কারো কাছে বিক্রি করা হয়নি।

কোহিনুর শুধু এক হাত থেকে অন্য হাতে হস্তান্তর হয়েছে যুদ্ধের বিনিময়ে অথবা যৌতুকের মাধ্যমে। মুঘল সম্রাট আকবর তার আত্মজীবনী বাবর নামায় কোহিনুর হীরার উল্লেখ করেছেন।

তখন পর্যন্ত মুঘল রাজকোষে কোহিনুর হীরা একটি সামান্য হীরাই ছিল,আলাদা করে কোহিনুর বিশেষ কোনো তকমা তখনো পায়নি।

বাবরের পুত্র হুমায়ন তার বাবার কাছে কোহিনুরের মূল্য জিজ্ঞাসা করে ? তখন সম্রাট বাবর হুমায়ন কে বলে কোহিনুর হীরার বিনিময়ে যদি আরো অন্যান্য রত্নের সঙ্গে মূল্যাঙ্কন করা যায়

তবে কোহিনুরের মূল্য দিয়ে বর্তমান পৃথিবীর সমস্ত মানুষের মুখে দুই দিনের অন্ন তুলে দেওয়া যেতে পারে। মুঘল রত্ন ভান্ডার লুঠ করে কোহিনুর হীরা নাদির শাহের হাতে পৌঁছালে

নাদির শাহের বেগম কোহিনুরের মূল্য কত নাদির শাহের কাছে জানতে চান ? নাদির শাহ তখন বলেন আমার রাজ্যের ০৫ জন সবথেকে বলবান পুরুষকে ডেকে

যদি তাদের হাতে ঢিল দিয়ে,পূর্ব,পশ্চিম,উত্তর,দক্ষিণ চার দিশায় এবং একজনকে আকাশের উপর দিকে ঢিল ছুড়তে দেওয়া হয়,তারপর তাদের ঢিল এই ০৫ দিকে যতটা দূর পর্যন্ত যাবে

ততটা দূর পর্যন্ত চারিদিক সোনা,রুপো এবং আরো অন্যান্য মূল্যবান রত্ন দিয়ে পাহাড় সমান করে দিলেও হয়তো কোহিনুরের সমতুলি মূল্য জোটানো যাবেনা।

কোহিনুর হীরার ইতিহাস
কোহিনুর হীরার ইতিহাস

আজথেকে ৫০-৬০ বছর আগে চীনের হংকং এ একটি হীরার প্রদর্শনী হয়,সেখানে দেশ বিদেশের বিভিন্ন দামি সব হীরার নিলামী হচ্ছিল।

সেই প্রদর্শনীতে গ্রাফ পিঙ্ক নামের ২৪.৭৮ ক্যারেটের একটি হীরা ছিল,সেই হীরাটি ঐ পদর্শনীতে বিক্রি হয় ৪৬ মিলিয়ন ড্রলারে।

বর্তমানে কোহিনুর ইংল্যান্ডের মহারানীর মুকুটের শোভা বাড়াচ্ছে। কোহিনুরের বর্তমান ওজন হল ১০৫ ক্যারেট যা আগের তুলনায় অনেকটা কম হয়ে গেছে।

হং কং এর হীরার প্রদর্শনীতে বিক্রি হওয়া হীরার মূল্যের সঙ্গে তুলনা করে,কোহিনুর হীরার মূল্য নির্ধারণ করলে কোহিনুরের আনুমানিক মূল্য হয়ে যায় ১,৫০০০ হাজার কোটি টাকা।

কোহিনুর হীরা অভিশপ্ত কেন (Why is Kohinoor diamond unlucky)


বাবরের জীবনী বাবর নামায় উল্লেখ পাওয়া যায় ১৯২৪ সালে কোহিনুর হীরা ভারতের কাতালীয় নামের এক রাজ পরিবারের সম্পদ ছিল শুধু মাত্র। তবে ১৩০৬ সালের পর থেকে

কোহিনুর হীরা নিয়ে একটি গল্প তথ্য শুনতে পাওয়া যায়,কাতালীয় রাজাদের কাছে এই হীরা থাকার সময় কোহিনুর হীরা নিয়ে একটি ভবিষ্য় বাণী করা হয়।

ভবিষ্য়বানীতে বলা হয় কোহিনুর হীরা যদি কোনো পুরুষ নিজের কাছে রাখে তাহলে সে অসীম ক্ষমতার অধিকারী হবে এবং পৃথিবী জুড়ে রাজত্ব করবে।

কিন্তু সেই ক্ষমতা সাময়িক ভাবে সেই পুরুষের কাছে স্থায়ী হবে,হীরা রাখার কিছুদিন পরেই সেই ব্যক্তির খারাপ দিন শুরু হবে,তাই কোহিনুরকে কোনো নারী কিংবা দেবতার কাছে উৎসর্গ করাটাই শ্রেয় হবে।

যদিও এর আগে কেউ কোহিনুর হীরার অভিশাপ নিয়ে সেরকম ভাবে নজর দেয়নি,কিন্তু এই হীরা কাতালীয় রাজাদের কাছে থাকার সময় কোহিনুরের অভিশপ্ত হওয়ার ঘটনা বাস্তবতা পেতে দেখা যায়।

১৩২০ সালে বিন-তুঘলক কাতালীয় রাজবংশের উপর আক্রমন করলে কাতালীয় বংশ পুরোপুরি ভাবে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কাতালীয় বংশের তাৎক্ষণিক পতনকে

কোহিনুর হীরার অভিশপ্ত হওয়ার কারণ বলে দায়ী করা হতে থাকে। এরপর থেকে কোহিনুর হীরাকে নিয়ে করা ভবিষ্যবাণীকে মানুষ সত্যতার সাথে বিশ্বাস করতে থাকে।

মানুষের মধ্যে বিশ্বাস হয়ে যায় কোহিনুর হীরাকে যদি কোনো পুরুষ ধারণ করে তার বংশ নিবংশ হয়ে যাবে। পরে কোহিনুর এক রাজা থেকে অন্য রাজার হাতবদল হয়ে

kohinoor diamond history
kohinoor diamond history

মুঘল বাদশাদের হাতে এসে পৌঁছায় এবং সময় বিশেষে মুঘল সম্রাটদের রত্ন ভান্ডারের শোভা বাড়াতে থাকে। সম্রাট বাবরের কাছে যখন কোহিনুর ছিল তখন এই কোহিনুরকে হীরাহি বাবর বলা হত।

পরে কোহিনুর হীরাটি সম্রাট আকবরের হাতে এসে পৌঁছায়,কিন্তু আকবর কখনো কোহিনুরকে নিজের হাতের আংটি কিংবা সিংহাসনে ব্যবহার করেননি। তিনি কোহিনুরকে

তার রত্ন ভাণ্ডারে গচ্ছিত রেখেছিলেন। সেই জন্য মনে করা হয় সম্রাট আকবর বিনা দ্বন্দে বেশ কিছুদিন মুঘল সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে বেশ কিছু প্রজাহিতোষী কাজও হয়েছিল,যার জন্য সম্রাট আকবরকে মহান সম্রাট বলা হয়। এরপরে কোহিনুর হীরা আকবরের হাত হয়ে সম্রাট শাহজাহানের হাতে পৌঁছায়।

শাহাজান তার জন্য একটি শৌখিনতম অতিসুন্দর রাজ সিংহাসন তৈরি করেন। এই সিংহাসনটি তৈরি করেন সৈয়দ গিলানি নামের একজন কারিগর।

মোট ০৭ কেজি সোনা দিয়ে মুড়ে ০৭ বছরের চেষ্টায় আরও অন্যান্য রত্নের সঙ্গে ৭৯৩ ক্যারেটের কোহিনুর হীরাটিকে সিংহাসনে লাগানো হয়। আর সম্রাট শাহজাহান সিংহাসনটির নাম রাখেন তক্ত-ই-মুরাসা

এই সিংহাসনটিকে শাজাহানের ময়ূর সিংহাসন বলে আমরা চিনি। এই ময়ূর সিংহাসনটি কারুকার্যের দিক থেকে এতটাই চিত্তকর্ষক ছিল যে

ময়ূর সিংহাসনের কারুকার্য দেখার জন্য দেশ বিদেশের নামি দামি জহুরিরা মুঘল দরবারে ভিড় জমাতো। মনে করা হয় শাহজাহানের ময়ূর সিংহাসনে কোহিনুর লাগানোর পর থেকে

শাহজাহানের খারাপ সময় শুরু হয়ে যায়। ময়ূর সিংহাসন তৈরি করার কিছুদিন পরেই শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মারা যান এবং তিনি প্রিয় মমতাজের স্মৃতিতে তিনি তাজমহল বানিয়ে ফেলেন।

শেষ বয়সে শাহজাহানের পুত্র ঔরঙ্গজেব শাহজাহানকে বন্দী করে জেলে পুড়ে দেয়। ঔরংজেব দিল্লীর সিংহাসনে আসীন হলে কোহিনুর ঔরংজেবের হাতে এসে পৌঁছায়।

ঔরংজেব কোহিনুর হীরাটিকে পালিশ করে চমক ফিরিয়ে আনার জন্য হোস্টিনো বর্গীয়া নামের এক জহুরীকে তুর্কি থেকে নিয়ে আসেন।

হোস্টিনো বর্গীয়া কোহিনুরকে পালিশ করার সময় হীরাটির মধ্যে চির ধরিয়ে ফেলেন,এরপর হীরাটি কয়েকটি খন্ডে ভেঙে যায়। যার ফলে ৭৯৩ ক্যারেটের কোহিনুর হীরার ওজন

অনেকটাই কমে ১৮৬ ক্যারেট হয়ে যায়। জহুরীর ভুলের জন্য ঔরঙ্গজেব জহুরিকে নগদ ১০,০০০ টাকা জরিমানা করেন।

এরপর কোহিনুরকে ঔরংজেব তার আংটিতে ধারণ করেন। এরপরেই ঔরংজেবের জীবনে খারাপ দিন ঘনিয়ে আসে তিনি তার নিজ ভাইদের হত্যা করে দিল্লীর সিংহাসনে বসেন।

১৭৯৩ সালে নাদির শাহ মুঘলদের পরাজিত করে কোহিনুরকে সাথে করে ইরানে নিয়ে চলে যায়। আর নাদির শাহই হীরাটির নাম কোহিনুর রাখেন।

কিন্তু নাদির শাহ এর হাতে কোহিনুর হীরা এলে নাদির শাহের কপালেও দুঃখ নেমে আসে,কোহিনুর হাত লাগার কিছুদিন পরেই নাদির শাহের নিজের লোকেরাই তাকে হত্যা করে।

নাদির শাহের উত্তরধিকারী স্বরূপ নাদির শাহের নাতি শাহরুখ সিংহাসনে বসেন। নাদির শাহের একজন বিশ্বস্ত সেনাপতি ছিলেন আহমেদ আবদালি।

সেনাপতি আহমেদ আবদালি শাহরুখকে একজন অভিভাবকের ন্যায় রাজকার্য পালনে সাহায্য করেন এবং শাহরুখ খুশী হয়ে কোহিনুর আহমেদ আবদালিকে দিয়ে দেন।

ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনায় ছিল প্রথম ঘটনা,যেখানে কেউ বিনা যুদ্ধে প্রথমবার কোহিনুরকে শুধু প্রতিদান হিসাবে দিয়েছিল।

আহমেদ আবদালি ছিলেন আফগানিস্তানের বাসিন্দা,তিনি কোহিনুর হাতে পাওয়ার পর তার নিজের দেশ আফগানিস্তান নিয়ে চলে আসেন এবং

আফগানিস্তানের রাজা আহমেদ শাহ দুরানির হাতে তুলে দেন। কিন্তু দুঃভাগ্যের বিষয় আহমেদ শাহ দুরানি বেশিদিন কোহিনুরের ঐশ্বর্য সুখ ভোগ করতে পারেননি।

কোহিনুর হাতে আসতে না আসতেই কিছুদিনের মধ্যে আহমেদ শাহ দুরানি মারা যান। এরপর সুজা শাহ দুরানি কোহিনুর হীরা এবং রাজ্যের উত্তরিধকারী হন।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কাকতালীয়ভাবে সুজা শাহ দুরানি তার সামন্ত রাজারা কৌশলে ছলনার আশ্রয় নিয়ে সুজা শাহ দুরানীকে হত্যা করার চেষ্টা করেন।

সুজা শাহ দুরানি কোনো রকমে প্রাণ বাঁচিয়ে লাহোরে পালিয়ে এসে রাজা রণজিৎ সিংহের শরণাপন্ন হন। ১৮৯৩ সাল,লাহোর তখন ভারতের অভিন্ন অঙ্গ ছিল।

মহারাজা রণজিৎ সিংহের চেস্টায় সুজা শাহ দুরানি তার রাজপাট ফিরে পায় এবং বিনিময়ে কোহিনুর হীরা শিখ রাজা রণজিৎ সিংহের হাতে সমর্পন করে দেন।

আরো পড়ুন : ইন্ডিয়া গেট নির্মাণের ইতিহাস। 

ব্রিটিশদের হাতে কোহিনুর হীরা কিভাবে পৌঁছাল (How did Brithish get Kohinoor)


কোহিনুর হীরা রাজা রণজিৎ সিংহের দখলে এলে তিনি খুব বেশিদিন কোহিনুরকে নিজের ভোগ দখলে রাখতে পারেন নি। কোহিনুর হীরা দখলে আসার পর থেকে রাজা রণজিৎ সিংহের

শারীরিক অবস্থার অবন্নতি হতে শুরু করে। একসময় রাজা রণজিৎ সিংহের সেনা বাহিনীকে ইংরেজরা পর্যন্ত লৌহ দেওয়ালের সাথে তুলনা করতো,সেই রণজিৎ সিংহের অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে

ইংরেজরা রণজিৎ সিংহকে হারিয়ে দিয়ে ক্ষমতা দখল করে নেয়। অপরদিকে রাজা রণজিৎ সিংহের একমাত্র পুত্র বয়সে নাবালক হওয়ায় ব্রিটিশরা অনায়াসে রাজকোষ লুঠ করে চলে যায়।

রাজা রণজিৎ সিং কোহিনুর হীরাকে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে উৎসর্গ করার জন্য মিনতি জানায় কিন্তু রণজিৎ সিং এর কোনো মিনতি ইংরেজরা শোনেননি।

কারণ অনেক আগে থেকেই ব্রিটিশরা কোহিনুর হীরার ইতিহাস (Kohinoor Diamond History) শুনে আসছিল তাই তারা এতো দামি একটি রত্নকে নিজেদের কাছ থেকে হাত ছাড়া করতে চাননি।

১৩৯৬ সালে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গভর্নর লর্ড ডালহৌসি রাজা রণজিৎ সিংহের ১৩ বছরের নাবালক পুত্রকে সঙ্গে করে কোহিনুর হীরাকে নিয়ে ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

ইংল্যান্ডে রাজা রণজিৎ সিংহের পুত্রের হাত দিয়ে হীরাটিকে রানী ভিক্টরিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হয়। রানী ভিক্টরিয়ার কোহিনুর হীরার ডিজাইন পছন্দ হয়না।

kohinoor diamond history
kohinoor diamond history

তাই তিনি হীরাটিকে পালিশ এবং নতুন করে নক্সা করার জন্য ডাচ নামের একজন জহুরিকে নিয়োগ করেন। টানা ৪০ দিনের চেষ্টায় কোহিনুরকে নতুন করে আকার দিয়ে

রানী ভিক্টরিয়ার মুকুটে বসানো হয়। কোহিনুরকে পালিশ করার পর কোহিনুর আরও চিত্ত আকর্ষক হয়ে ওঠে। কিন্তু হীরাটিকে নতুন করে রিডিজাইন করায়

কোহিনুর হীরার ওজন ১৮৬ ক্যারেট থেকে কমে ১০৫ ক্যারেট হয়ে যায়। মহারানী ভিক্টরিয়া কোহিনুর হীরার ইতিহাস (Kohinoor Diamond History) এবং অভিশপ্ত হওয়ার

কথা আগে থেকেই শুনে আসছিলেন। তাই তিনি কোহিনুর হীরার ইতিহাস (Kohinoor Dimond History) ও অভিশপ্ততার কথা মাথায় রেখে কোহিনুর হীরাকে নিয়ে একটি লিখিত দলিল করে যান।

রানী ভিক্টরিয়া তার দলিলে লিখে যান ইংল্যান্ডের রাজ সিংহাসনে তার অবর্তমানে যিনি বসবেন এবং কোহিনুর হীরার উত্তরিধিকারী হবেন তাদের মধ্যে কোনো পুরুষ যেন

কোহিনুরকে তার ব্যক্তিগত স্বার্থে নিজে ব্যবহার না করে। কোহিনুর হীরা বসানো মুকুটটি যেন সর্বদা তাদের রানীদের মাথাতেই পরানো হয়,আর আজও ইংল্যান্ডের রাজারা ভিক্টরিয়ার এই দলিল ফলো করে আসছেন।

আরো পড়ুন : মিশরের রহস্যময় পিরামিড। 

পরিশিষ্ট


কিন্তু কাকতালীয় হলেও সমস্ত ঘটনাক্রমকে জুড়ে দেখলে দেখতে পাওয়া যায় কোহিনুর ইংল্যান্ডে পৌঁছাতে না পৌঁছতে ইংল্যান্ডের খারাপ সময় শুরু হয়ে যায়।

এক সময় লোক মুখে প্রচলিত প্রবাদ ছিল পৃথিবীর যেখানে,যেখানে সূর্যের আলো পড়বে সেখানে,সেখানে ব্রিটিশরা তাদের উপনিবেশ গড়ে তুলবে।

কিন্তু দুঃভাগ্যক্রমে ইংল্যান্ডের হাতে কোহিনুর হীরা আসার পর থেকে ১৯৩৬-১৮৪০ সালের মধ্যে ব্রিটিশরা যেখানে,যেখানে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করেছিল,সেখান থেকে তাদের উপনিবেশ হারাতে থাকে।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করলে কোহিনুর হীরাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য লোকমাঝে জোর সোর্ গোল ওঠে,কিন্তু এর সাথে সাথে ভারত সহ পাকিস্তান,

আফগানিস্তান এবং ইরানের মত দেশ কোহিনুর হীরাকে তারা তাদের বলে দাবি জানায়। যাই হোক কোহিনুর হীরাকে দেশে ফিরিয়ে আনার তৎপরতা সরকার সেরকম ভাবে কোনোদিন করেনি।

তাই আজও কোহিনুর হীরা ইংল্যান্ডের রানীর মুকুটে শোভা বাড়াচ্ছে। কোহিনুর হীরা ভারতে ফিরিয়ে নিয়ে আসার ব্যাপারে আপনাদের কি মতামত আমাদের কমেন্ট করে জানান।